নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা মাদক পরিবহনের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সংযোগস্থল হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাকে ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাদকের চালান আনা-নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয় একাধিক সূত্রের। অভিযোগ রয়েছে, এলাকাটির আশপাশের বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গুদাম ও বিভিন্ন স্থাপনাকে মাদক মজুতের জন্য ব্যবহার করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সাইনবোর্ড ও এর আশপাশের এলাকায় মাদক পরিবহন, মজুত ও সরবরাহের সঙ্গে একাধিক চক্র জড়িত। এসব চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তি ও প্রভাবশালীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
সাইনবোর্ড এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান একে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জটিল এলাকায় পরিণত করেছে। ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা থানার সীমানা কাছাকাছি হওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী অবস্থান ও সড়ক যোগাযোগের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন এলাকায় চালান সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে এসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বা অভিযান একেবারেই নেই বললেই চলে।
একসময় কাঁচপুর সেতুর ঢাল ও রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকায় মাদক কারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক থাকার অভিযোগ ছিল। স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাদক কারবারের কিছু চক্র স্থান পরিবর্তন করে সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক এলাকায় সক্রিয় হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাস, পণ্যবাহী যানবাহন, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে মাদকের চালান নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করছে। এসব চালানের মধ্যে ইয়াবা, গাঁজা ও ফেনসিডিল রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সাইনবোর্ড এলাকায় পৌঁছানোর পর চালানগুলো ছোট যানবাহনে স্থানান্তর করে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় নেওয়া হয়। ভুঁইগড়ের শান্তিধারা, গিরিধারা, তুষারধারা, জিরো পয়েন্ট, পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন এলাকা, সোনালী মার্কেটের আশপাশসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক মজুত ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর আরও দাবি, কিছু বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের গুদাম মাদক সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক মাদক কারবারের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, তাঁদের স্বজন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকটি সূত্র।
স্থানীয়দের মতে, মাদক কারবারিরা রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব কাজে লাগিয়ে থাকলে তা প্রতিরোধে দল-মতনির্বিশেষে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, সাইনবোর্ড থেকে নারায়ণগঞ্জ শহর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, কেরানীগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের দিকে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি নৌপথ ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও চালান পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার আমিনবাজার, গেণ্ডারিয়া, কমলাপুর ও শ্যামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে মাদক প্রবেশের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোড এলাকায় পার্সেল সার্ভিসের আড়ালে মাদক পরিবহনের অভিযোগও তুলেছেন সূত্রগুলো। তবে এসব রুট ও পরিবহনপদ্ধতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় দুই শতাধিকের ও বেশী স্থানে মাদক কেনাবেচা হয়। শহরের হাজীগঞ্জ, তল্লা, ব্যাংক কলোনি, মাছুয়াপাড়া, আমলাপাড়া, জামতলা, বাবুরাইল, জিমখানা, নিতাইগঞ্জ, নয়ামাটি ও ৫ নম্বর ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকার নাম উঠে এসেছে।
ফতুল্লার কুতুবাইল, দেওভোগ, শিবু মার্কেট, মাসদাইর, ইসদাইর, সস্তাপুর, গাবতলী, বিসিক, মুসলিমনগর, পঞ্চবটী, হরিহরপাড়া, ফতুল্লা রেলস্টেশন,ব্যাংককলোনী, পিলকুনি, পাগলা জেলেপাড়া,মুন্সিবাগ ও ভুঁইগড়ের বিভিন্ন এলাকাতেও মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব এলাকায় মাদক সরবরাহের একটি অংশ সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আসে।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে তরুণদের চিকিৎসা নিতে আসার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি কেন্দ্রের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিচালক বলেন, মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও পরিস্থিতির কারণে এ খাতে বাণিজ্যিক প্রবণতা বাড়ছে বলে তাঁর ধারণা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। সাইনবোর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো, আন্তঃথানা সমন্বয় জোরদার করা, সন্দেহজনক গুদাম ও পরিবহনব্যবস্থার অভিযোগ তদন্ত করা এবং মাদক কারবারে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি।
এ বিষয়ে নারায়নগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অপস) তারেক মেহেদী জানান, আমরা নিয়মিত ভাবে মাদকের বিভন্ন স্পটগুলোতে অভিযান চালাচ্ছি। কোন তথ্য পেলেই আমরা সেখানেই অভিযান পরিচালনা করছি। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি স্পট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।চনপাড়া বস্তি ও প্রায় বিল্পুত হওয়ার পথে। সঠিক তথ্য পেলে আমরা অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করবো বলে জানান তিনি।
সাইনবোর্ডকেন্দ্রিক মাদক কারবার কতোটা বিস্তৃত, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কোন পথে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের গ্রেফতার করে মাদক সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহলগুলো।