সংবাদচর্চা রিপোর্ট
নদী দখলের মতোই কয়েক দশক ধরে অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি। ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ রেলপথের দুই পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে কাঁচা-পাকা দোকান, অস্থায়ী বাজার, গ্যারেজ, ট্রাক-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড ও বস্তি। কোথাও কোথাও রেললাইনের একেবারে পাশ ঘেঁষে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রেলওয়ের জমি দখল করে ভাড়া ও চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে।
বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না এসব জমি। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা এবং রেলওয়ের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দখলদারত্ব টিকে আছে। কোথাও কোথাও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও অবৈধভাবে আদায় করা অর্থের ভাগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নম্বর রেলগেট থেকে শ্যামপুর পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, রেললাইনের দুই পাশে রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানঘর, ভাসমান খাবারের দোকান, অস্থায়ী বাজার, গ্যারেজ ও টিনের ছাপরা ঘর। এসব স্থাপনার কোনো কোনোটিতে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি বসবাসও করছেন লোকজন। অভিযোগ রয়েছে, জমি দখল করে দোকান বসানোর পর সেগুলো থেকে নিয়মিত ভাড়া ও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
এদিকে এই রুটে ডাবল ডুয়েলগেজ লাইনের কাজ ও শাখা সড়ক নির্মাণের জন্য এনে রাখা পাথর রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিপুল অর্থমূল্যের এসব পাথর লুটের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত।
রেললাইনের দুই পাশের দখল করা জায়গার কিছু অংশে মাদক কেনাবেচার আস্তানা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এসব স্থানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা হয়। এর প্রভাব পড়ছে আশপাশের জনবসতি, বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের ওপর। একই সঙ্গে রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
চাষাড়া রেলস্টেশন ঘিরে মাদক কারবারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ বছরে সেখানে আট থেকে দশটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া গুমের অভিযোগও রয়েছে।
ফতুল্লা রেললাইন বটতলা এলাকায় রেলওয়ের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান, একটি বাজার, ট্রাক-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড এবং ছোট ছোট টিনের ঘর। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব ঘরে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি পরিবার বসবাস করছে।
বাজারটির জমি লিজ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও লিজের শর্ত, জমির শ্রেণি ও ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ আছে, কৃষিভিত্তিক লিজ নিয়ে সেখানে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে দোকান ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।
পাশেই রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে ট্রাক-মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা আদায়ের নিয়ন্ত্রণও বদলেছে। আগে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ছিল, বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠছে।
শারজাহান রোলিং মিলস এলাকার কাছে রেললাইনের পূর্ব পাশের জমিতে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী বাজার। রেললাইন বটতলা থেকে চন্দ্রাবাড়ী পর্যন্ত ডাবল ডুয়েলগেজ লাইনের নির্মাণ কাজ ও শাখা সড়ক নির্মাণের জন্য আনা পাথর সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব পাথরের আর্থিক মূল্য বিপুল । সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে।
ফতুল্লা রেলস্টেশনের দুই পাশে অস্থায়ী বাজার ও অসংখ্যা দোকান গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা ঘিরে স্থানীয় একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। দোকান বসানো ও ব্যবসা পরিচালনার বিনিময়ে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও এককালীন টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দোকানিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পাশাপাশি বিনা মূল্যে খাবার, ফলসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যান। এ ছাড়া স্টেশনটির আশপাশে একাধিক মাদক কারবারের স্থান রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাঝেমধ্যে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।স্টেশন এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের উপদ্রব নিয়েও যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
আলীগঞ্জ রেললাইনের দুই পাশে রেলওয়ের জমি দখল করে দোকানঘর নির্মাণ এবং নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পাগলা রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের দখল চোখে না পড়লেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের ভাষ্য, স্টেশন ছেড়ে সামনের দিকে এগোলেই রেলওয়ের জমিতে ছোট ছোট ঘর, দোকান, ভাঙারির ব্যবসা, অস্থায়ী বাজার ও রিকশার গ্যারেজ দেখা যায়। এসব স্থাপনা ঘিরে রেলওয়ের জমির ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শ্যামপুর পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দুর্ঘটনা এড়াতে রেললাইনের দুই পাশের নির্ধারিত নিরাপত্তা এলাকা খালি রাখা জরুরি। অথচ ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ রেলপথের বিভিন্ন অংশে রেললাইনের কাছাকাছি স্থাপনা থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে রেলকর্মীদের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে ব্যবহার করা হলে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে। আবার অনুমোদিত লিজের শর্ত ভঙ্গ করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা হলে তা সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের শামিল হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কিছুদিন পর আবারও দখল ফিরে আসে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এভাবে দখল বজায় রাখা কঠিন। উচ্ছেদ অভিযানের আগে দখলদারদের খবর জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, দোকান ও বাজার থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, রেলওয়ের কিছু কর্মী এবং পুলিশের অসাধু সদস্যদের কাছে পৌঁছায়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন তদন্ত, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
ঢাকা–নারায়ণগঞ্জ রেলপথের দুই পাশের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা, মাদক কারবার, চাঁদা আদায় এবং নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান নয় বলে স্থানীয়দের দাবি। এ পরিস্থিতিতে রেলওয়ের জমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ, বৈধ লিজের তালিকা প্রকাশ, অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত, পাথর সরানোর অভিযোগ তদন্ত এবং স্টেশনভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠেছে।
রেলওয়ের জমি উদ্ধার করে নিরাপদ রেল চলাচল নিশ্চিত করা এবং সরকারি সম্পদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে দখলদারদের পাশাপাশি অবৈধ দখল টিকিয়ে রাখতে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।