, ,

মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আল-সাইয়েদকে ঘিরে বাড়ছে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের আসন্ন সিনেট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদকে ঘিরে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচারণা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় মুসলিম এবং আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মুখে নিজেদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তবে এসব হুমকির মুখে মুসলমানরা ভীত না হয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হচ্ছে। তার বক্তব্য, জন্মসনদ থাকলেই কেউ প্রকৃত আমেরিকান হয়ে যায় না।

নির্বাচনি প্রচারণার ময়দানে ডেট্রয়েট ও এর আশপাশের এলাকায় মুসলিমবিরোধী কর্মকাণ্ডের ঘটনা সামনে আসছে। ডেট্রয়েটের উপশহরের ডিয়ারবর্নের মেয়র আবদুল্লাহ হামুদ জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জরুরি সেবার নম্বরে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মেয়র হামুদের মতে, এই বিদ্বেষের চূড়ান্ত জবাব হতে পারে আল-সাইয়েদকে সিনেটে পাঠানোর মাধ্যমে। এর আগে একটি নির্বাচনি সভার বাইরে জেক ল্যাং নামক ব্যক্তি ক্রুসেডের প্রতীকসহ নানা উসকানিমূলক স্লোগান দেন এবং মুসলিমদের দেশছাড়া করার হুমকি দেন। ডেট্রয়েটে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপস্থিতিতে একটি নির্বাচনি সমাবেশের বাইরে ডানপন্থি উসকানিদাতা জেক ল্যাং বুলহর্নে মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেন। ল্যাং মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেন।

রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স সরাসরি আল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুড, হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরানের সঙ্গে গোপন যোগাযোগের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন। তার সহযোগীদের হাতে ছিল ক্রুসেডের প্রতীকসংবলিত সামগ্রী ও রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থী মাইক রজার্সের নির্বাচনি প্রচারপত্র। মাইক রজার্সের পক্ষে আয়োজিত এক সমাবেশে ট্রাম্প প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে আল-সাইয়েদকে আক্রমণ করেন।

এই অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ কখনোই উপস্থাপন করা হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও আল-সাইয়েদের নাম বিকৃত করে তাকে ‘জিহাদি’ বলে সম্বোধন করেছেন। এছাড়া সিনেটর টেড ক্রুজ তাকে ‘জিহাদি লেপ্রেচন’ বলে কটাক্ষ করে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছেন এবং রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র আরবদের ইতিহাস ও বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেছেন।

অধিকারকর্মী সুহাইলা আমেন এই পরিস্থিতিকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরবর্তী সময়ের চেয়েও সংকটজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, প্রেসিডেন্টের মতো দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষ ছড়ানো হলে তা সাধারণ মানুষের মাঝে বৈষম্য ও বিভেদ উসকে দেয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও মুসলিমরা এই মার্কিন সামাজিক কাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার ভাষায়, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরবর্তী সময়ও বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় অনেক সহজ ছিল।

আল-সাইয়েদ নিজেই এসব অভিযোগকে তার জনপ্রিয়তাকে খর্ব করার এবং রাজনৈতিক মূল বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডক্টরেটধারী এবং মিশিগানেই বেড়ে ওঠা আল-সাইয়েদ মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত ব্যর্থতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের মতো বিষয়গুলো আড়াল করতেই তার সম্প্রদায়কে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

ট্রাম্পের সমর্থক ডেভিড বিমার ৯/১১ হামলায় তার সন্তানকে হারানোর প্রসঙ্গ টেনে আল-সাইয়েদের মার্কিন নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া ট্রাম্পের সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্রায়ান প্যানেবেকার ভোটারদের ‘সমাজতান্ত্রিক ইসলামপন্থি’ প্রার্থীকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি জরিপেও দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ উত্তরদাতা মুসলিম প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছেন।

আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইনের যোগাযোগ পরিচালক আবদেলহালিম আবদেলরহমান বিষয়টিকে সরাসরি ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, আল-সাইয়েদের ধর্মপরিচয় ও নামকে ঘিরে যে সংশয় তৈরির চেষ্টা চলছে, তা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে সব ভয় ও নেতিবাচক প্রচারণার জবাবে মিশিগানের মুসলমানরা নাগরিক সক্রিয়তা ও ভোটের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।