যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা কতটা বহাল থাকবে, তা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। দেশটির প্রায় ২১ কোটি নিবন্ধিত ভোটার এ নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আইনসভা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে। ব্যালটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম সরাসরি না থাকলেও এই ভোটাভুটি তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নীতি বাস্তবায়নের বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রজনন অধিকার, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থাও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোয় আইন প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট সংস্থানের মূল দায়িত্ব পালন করে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ লাভ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। কংগ্রেস ছাড়াও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভা ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি নির্বাচনে নাগরিকরা তাদের রায় প্রদান করবেন। প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ী গ্রাহাম প্ল্যাটনার জুলাইয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার পর জ্যাকসন এই লড়াইয়ে এসেছেন।
আসন বিন্যাস ও নির্বাচনের পরিধি
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের মোট ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন পরিচালিত হবে। নিয়মিত নির্বাচনের বাইরে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে নতুন গভর্নর নির্বাচনের জন্য ভোট গ্রহণ করবেন নিবন্ধিত সাধারণ ভোটাররা। নতুন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি শপথ নেবেন।
- প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন: ৪৩৫টি (সবকটিতেই নির্বাচন)।
- সিনেটের মোট আসন: ১০০টি (এর মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন)।
- গভর্নর পদে নির্বাচন: ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে।
- বিশেষ আসন নির্বাচন: ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক টড বেল্ট একটি ঐতিহাসিক তথ্য উল্লেখ করে জানান, ১৯৪৬ সাল থেকে অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ দশমিক ৫টি আসন হারিয়ে থাকে। সেই হিসাব অনুযায়ী বর্তমান ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির জন্য নিম্নকক্ষ রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক নাদিয়া ব্রাউন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতি বা নির্বাচন সর্বদাই ব্যাপক মনোযোগ পেয়ে থাকে। তবে সাধারণ অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক স্থানীয় পর্যায়ের সরকারের সঙ্গেই দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। ব্যালটে থাকা নানা স্থানীয় প্রস্তাব ও গণভোট সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নীতি নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।
কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ ও প্রভাব
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক টড বেল্ট জানান, ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে সমর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ নীতিগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের দখল পেলে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অপরিহার্য নয়—এমন সব অতিরিক্ত ব্যয়সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের কাজ কার্যত থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালেই ট্রাম্পের প্রশাসনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর সুযোগ পাবে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে রিপাবলিকানরা অতিরিক্ত ৯টি আসনে সুবিধা পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন। যেসব নির্বাচনী এলাকায় দুই দলেরই জয়ের বাস্তব সুযোগ রয়েছে, সেগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন বলা হয়।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ জন সদস্যের প্রত্যেকে নিজ নিজ নির্দিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তাদের পদের মেয়াদ দুই বছর। প্রতি ১০ বছর পর পরিচালিত জাতীয় জনশুমারির ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা অনুযায়ী আসন বন্টন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের আসন সংখ্যা ৫২টি। বিপরীতে কম জনসংখ্যার ওয়াইওমিং ও ভারমন্টের মতো অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদের আসন মাত্র ১টি করে।
নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে যেকোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তত ২১৮টি আসনে জয়লাভ করতে হয়। বর্তমানে এই কক্ষে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি রয়েছে, আর একজন স্বতন্ত্র সদস্য রিপাবলিকানদের সাথে অবস্থান করছেন। এবারের নির্বাচনে মাত্র অল্প কিছু আসনের ব্যবধান পুরো নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ করে দিতে পারে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে থাকা জোটের মোট সদস্য ৪৭ জন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে টেক্সাস ও কানসাসের আসনগুলো নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের আগ্রহ বেড়েছে।
সিনেট ও বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে ১০০ জন সদস্য থাকেন এবং প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে সমান দুজন করে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা ছোট বা বড় যাই হোক না কেন, এখানে প্রতিনিধিত্বের সমতা বজায় রাখা হয়। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর হলেও প্রতি দুই বছর পর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার নিয়মিত ৩৩টি এবং বিশেষ ২টি সহ মোট ৩৫টি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে যাওয়া ৩৫টি সিনেট আসনের মধ্যে ২২টি রিপাবলিকান এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে নিট চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১টিতে পৌঁছাতে হবে। তবে আসন সংখ্যা ৫০-৫০ সমতায় পৌঁছালে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সিদ্ধান্তমূলক ভোটের (কাস্টিং ভোট) সহায়তায় রিপাবলিকানদের হাতেই উচ্চকক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সদস্য ৫৩ জন।
সিনেটের ক্ষমতা কেবল আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নয়; কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের বিচারক নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কেন্দ্রীয় আদালতের বিচারকেরা আজীবন দায়িত্ব পালন করেন, যার ফলে সিনেটের ভৌগোলিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ ছাড়া যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক শেষ করে ভোটাভুটিতে যাওয়ার জন্য সিনেটে সাধারণত ৬০টি ভোটের প্রয়োজন পড়ে। সিনেটেও সাধারণত কয়েকটি আসন হারিয়েছে তারা।
নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটারদের উদ্বেগ
এবারের সিনেট নির্বাচনের মধ্যে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফের সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্সের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই নজর কাড়ছে। জর্জিয়ায় কোনো প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান, তবে আগামী ১ ডিসেম্বর সেখানে দ্বিতীয় দফার ভোট বা রান-অফ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া মেইনে রিপাবলিকান সুসান কলিন্সের বিপরীতে লড়াই করছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। নিউ হ্যাম্পশায়ারে শূন্য আসনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস ও রিপাবলিকান জন সুনুনু।
নির্বাচনে ভোটদাতাদের জন্য অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি তেলের বর্ধিত দাম, আবাসন খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সাধারণ নাগরিকরা অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রভাব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ও তথ্যকেন্দ্রের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ভোট গ্রহণ ও প্রক্রিয়ার হিসাব
নির্দলীয় সরকারি সংস্থা ইউএসএফ্যাক্টসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য যোগ্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি। ভোটার নিবন্ধনে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া (২ কোটি ৩২ লাখ), টেক্সাস (১ কোটি ৭৪ লাখ) এবং ফ্লোরিডা (১ কোটি ৭০ লাখ)। অন্যদিকে কম ভোটার থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়াইওমিং (২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৬৮ জন) ও ভারমন্ট (৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৫ জন)। সরকারি তথ্য সংকলনকারী নির্দলীয় সংস্থা ইউএসএফ্যাক্টসের হিসাবে, দেশটির ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি বাসিন্দাদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত। এরপর টেক্সাসে ১ কোটি ৭৪ লাখ এবং ফ্লোরিডায় ১ কোটি ৩৬ লাখ নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। অন্যদিকে ওয়াইওমিংয়ে নিবন্ধিত ভোটার ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৬৮, ভারমন্টে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৫ এবং আলাস্কায় ৬ লাখ ৩ হাজার ৩১০ জন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করছেন ৪৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করছেন ৫ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। তাদের ৪২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৪২ শতাংশ রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে নারী ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৪৫ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৩১ শতাংশ। লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও ভোটারদের পছন্দে পার্থক্য রয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার পর মার্কিন পূর্বাঞ্চলে পর্যায়ক্রমে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে থাকবে। গ্রিনিচ মান সময় রাত ১১টা থেকে প্রথম ধাপে ভোটের ফলাফল গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করবে। শেষ পর্যন্ত এই ফল নির্ধারণ করবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কতটুকু তদারকি থাকবে এবং মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় বরাদ্দের রাশ কার হাতে যাবে।