ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক তৎপরতা ও সৌদি আরবের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বন্ধের বিনিময়ে দেশটিকে ১০০ কোটি ডলারের আর্থিক প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরব। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ইসরাইল হায়োমের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরাসরি তেহরানে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। সামরিক বাহিনীর হারকিউলিস পরিবহন বিমানে করে তিনি সশরীরে এই অর্থ নিয়ে গিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত এই অর্থের বিনিময় হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কেন ১০০ কোটি ডলার।
ইরানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই আলোচনায় সৌদি আরবের উদ্দেশ্য ছিল হুতি বিদ্রোহীদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির ভাষ্যমতে, প্রিন্স খালিদ বিন সালমান ও মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটের প্রতিনিধিরা তেহরান সফর করেছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল চলমান সংকট নিরসন, উত্তেজনা প্রশমন এবং আঞ্চলিক সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানে উৎসাহ দেওয়া। এটি মূলত কাতার ও পাকিস্তানের চলমান মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এই বৈঠকের আয়োজন করা হলেও পাকিস্তান ও তুরস্কের পক্ষ থেকে সামরিক সহায়তার পরিবর্তে কৌশলগত উপদেষ্টাদের অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের সম্মিলিত সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়া বা অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর পরিবর্তে তারা সামরিক উপদেষ্টাদের সহায়তার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমিত রেখেছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি এবং ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোরের কর্মকর্তারা। সৌদি আরবের এই উদ্যোগের পেছনে বড় কারণ হলো হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় তেল অবকাঠামো ও বিমানবন্দরসহ দেশটির অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার ও সৌদি বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার ফলে বিনিয়োগ সম্মেলনে নেতিবাচক প্রভাব ও তেল রপ্তানি বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা রিয়াদকে সংকটে ফেলেছিল। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ওপর ইরানের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এ ছাড়া একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয় সৌদি আরব।
সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তিন বছর আগে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতাই বর্তমানে সংঘাতের মূল কারণ। প্রস্তাবিত এই আর্থিক প্যাকেজের লক্ষ্য ছিল হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বেসামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন ও সরকারি কর্মীদের বেতনভাতা পরিশোধ করা। এর বিনিময়ে রিয়াদ শর্ত দিয়েছিল হুতিদের অবশ্যই সব ধরনের হামলা বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে হুতিরা উল্টো সৌদি আরবের বিরুদ্ধেই চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলছে এবং এই অভিযোগকে সামনে রেখেই তারা পাল্টা হামলার স্বপক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ইরানের পক্ষ থেকে হুতিদের পরোক্ষভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা পুরোপুরি বন্ধ করাই এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য। আর এ ক্ষেত্রে ইরান তাদের সহায়তা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।