২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি মাত্র দুই মাস। কিন্তু এর মধ্যেই পাঠ্য বই নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। বইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় ইতোমধ্যেই বিতরণ করা প্রায় ২০ লাখ বই ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব বই সংশোধনের পর পুনরায় ছাপিয়ে বিতরণ করতে হবে, যার ফলে সরকারি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রতিটি বই ছাপাতে বর্তমানে প্রায় ৫৭ টাকা খরচ হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে পাঠ্য বই নিয়ে বেধেছে তালগোল।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) এই ঘটনা নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিতর্কের মূলে রয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ের একটি ছবি। বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অংশে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তরের মধ্যে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে ‘দাঁড়িপাল্লা’র ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক। যদিও ২০২৫ সালের বইয়েও এটি ছিল এবং ২০২৬ সালে তা পরিবর্তন করে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি দেয়া হয়েছিল, তবে ২০২৭ সালের নতুন সংস্করণে আবারো সেই বিতর্কিত দাঁড়িপাল্লার ছবি ফিরে আসে। এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, বইয়ে পিরামিডের চারটি স্তরের নাম থাকলেও কোনো আইকন বা ছবি রাখা হবে না। বিতর্কের পর এনসিটিবি প্রথমে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠায় প্রতীক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়গুলো আরও পরিমার্জন করা হবে।
বিতর্ক শুধু আইসিটি বইয়েই সীমাবদ্ধ নেই। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে ‘নৌকা’র ছবি ব্যবহারের বিষয়টিও বড় আকারে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির বইয়ে ৩৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩টি এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি—মোট ৮২টি নৌকার ছবি রয়েছে। এসব ছবি ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও বিদ্যমান ছিল বলে জানা গেছে।
বইয়ের ছবি সংক্রান্ত এসব বিতর্কের প্রেক্ষাপটে সোমবার বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৯ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবশ্যই অবমুক্ত হতে হবে। অন্যথায়, ওইদিন অপরাহ্নে তারা তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত বলে গণ্য হবেন। এর আগে রোববার ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা গবেষণা কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল জোবায়েরকে খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে বদলি করা হয়েছে। আগের দিন বদলি করা হয়েছিল আরেক কর্মকর্তাকে।
অন্যদিকে, এনসিটিবি’র ভেতরেই কিছু কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন যে, বাংলা বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের নেপথ্যে থাকা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হলো না। এই বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, বদলির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। তাদের বদলি করার পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ বা এই প্রক্রিয়ায় তার কোনো ভূমিকা নেই বলে তিনি স্পষ্ট করেছেন। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও এই পরিস্থিতি এনসিটিবি’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।