, ,

ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রোগীদের জীবনসংগ্রাম: চড়া সুদে ঋণ ও অর্থকষ্ট

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার চিত্র প্রতিদিনের। স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে ৪২ শতাংশ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের তরুণী তমা আক্তারের পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলে তাঁকে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগে ১৩ অক্টোবর ভর্তি করা হয়। বাবা–মা প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। তাঁদের বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আটিগ্রাম ইউনিয়নে। বাকি সন্তানদের নানির কাছে রেখে তিনি ও তাঁর স্বামী হাসপাতালে এসেছেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তমাকে ৩১০ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। মেয়ের সুস্থতা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি।

তার রক্তে ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় ২২ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

রোববার থেকে তমাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। তমার মা লিপি আক্তার জানান, চার সন্তানের মধ্যে তমা সবার বড়। আর্থিক সংকটে থাকা এই পরিবারটি সহায়-সম্বল বিক্রির পাশাপাশি ঋণ করে গত এক মাসে মেয়ের জন্য ৭২ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। এছাড়া হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে পাটি পেতে থাকা পরিবারটি পরীক্ষার স্লিপের খরচ জোগাতেও প্রতিনিয়ত লড়াই করছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের আইসিইউর সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তমার মা লিপি আক্তারকে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তমার বাবা তরফ আলী আসেন হাতে রক্ত পরীক্ষার ৩৫০ টাকার একটি স্লিপ নিয়ে। এর আগে সকালে ৪০০ টাকার আরেকটি পরীক্ষা করিয়েছেন। পেশায় রংমিস্ত্রি বাবা জানান, সাহায্য নিয়ে, ঋণ করে, জমি বিক্রির টাকা থেকে এক মাসে মেয়ের জন্য ৭২ হাজার টাকা খরচ করেছেন। তমার বাবা তরফ আলী বলেন, মেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় প্রথম দিনই সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। মেয়ের কিডনি জটিলতা শনাক্ত হওয়ার পর এমআরআই করার জন্য চিকিৎসক ঢাকায় যেতে বলেন। ৬ অক্টোবর ঢাকায় একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১২ হাজার টাকায় এমআরআই করান। প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ ৪০০ টাকা। মা লিপি আক্তার বলেন, গ্রামে তাঁর স্বামীর কোনো ভিটেমাটিও নেই। নিজেদের খরচ কমাতে সকালে দুজন দুটো রুটি আর দুপুরে শুধু ডাল–ভাত খান।

তমার মতো আরও অনেক পরিবার ঢাকা মেডিকেলে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেনের তথ্যমতে, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এই হাসপাতালে চার হাজারের বেশি রোগী থাকেন। বিপুল রোগীর চাপ এবং দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার প্রয়োজনে অ্যাটেনডেন্টের খরচ মেটাতে রোগীর পকেট থেকে অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেয় না এবং সাধ্যমতো ওষুধ ও খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করে, তবুও বাজেটের তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় সংকট থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দ মাত্র ১০৭০ টাকা হওয়ায় রোগীদের ওপর ব্যয়ের চাপ পড়ছে। আর রোগী থাকে ৪ হাজারের বেশি। তিনি জানান, রোগীর সেবায় বাজেট আরও বাড়ানো হচ্ছে, এতে রোগীর নিজের পকেট থেকে খরচ কমতে পারে। স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশ যায় ওষুধে, বেশির ভাগই দিতে হয় রোগীকে।

পটুয়াখালীর জেলে জুয়েল সরদার চার মাস আগে ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে ডান পায়ে গুরুতর আঘাত পান। তিনি জানান, চার মাসে তাঁর তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যার মধ্যে আড়াই লাখ টাকাই নেওয়া হয়েছে চড়া সুদে। এক বছরে এর বিপরীতে সুদসহ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধের চাপ রয়েছে তাঁর ওপর। প্রথমদিকে প্রতিদিন ১৫টি করে ওষুধ খেতে হতো, যার বেশিরভাগই বাইরে থেকে কিনতে হতো। একই অবস্থা মুন্সিগঞ্জের কাজল রানীর। গত বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অর্থোপেডিক বিভাগে ভর্তি আছেন তিনি। গত এক সপ্তাহে ওষুধ ও ৯টি পরীক্ষার খরচ মেটাতে ২০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকে। ঋণ শোধের পর ১৫–২০ হাজার টাকা হাতে ছিল, সেই টাকাও মেয়ের চিকিৎসায় খরচ করে ফেলেছেন। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার মেয়েটা যে কী সুন্দর। কেউ যদি আমার মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিত, আমি তাঁদের বাসায় দাসি হয়ে থাকতাম!’। ডিএমসির বার্ন ইউনিটের বারান্দায় (রেড ইউনিটের অতিরিক্ত শয্যা ৩) প্রায় চার মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন জুয়েল সরদার (৩৬)।

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিত্রও একই। নড়াইলের তাহমিদ নামের চার বছরের এক শিশু রান্নার চুলায় পড়ে গিয়ে গুরুতর দগ্ধ হয়েছিল গত বছরের ২৮ নভেম্বর। দীর্ঘ চিকিৎসার অংশ হিসেবে এখন তার হাতের অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছে। হাসপাতালের আবাসিক সার্জন মো. হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন, যদিও অপারেশন ও অধিকাংশ ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়া হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার সময় পুষ্টিকর খাবার ও আনুষঙ্গিক খরচ রোগীর পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। হাসপাতালের দরিদ্র তহবিল থেকে সহায়তা প্রদানের সুযোগ থাকলেও রোগীর আধিক্য ও দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার কারণে অনেক দরিদ্র পরিবারই শেষ পর্যন্ত ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।