, ,

দিল্লিতে ঐতিহাসিক মসজিদ কেন্দ্রিক উচ্ছেদে বাস্তুচ্যুত ৭১৭ পরিবার

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অভিজাত রেসকোর্স এলাকায় অবস্থিত একটি শতাব্দী প্রাচীন মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ৩টি বসতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। মসজিদটির চারপাশে বসবাসকারী এসব মানুষের বাড়িঘর সম্প্রতি উচ্ছেদ করেছে কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি এক বিকেলে মসজিদের ভেতরে মাত্র চার-পাঁচজন মুসল্লিকে দেখা যায়। দিল্লিতে উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা নতুন নয় বলে মনে করেন নগরায়ণ ও আবাসনবিষয়ক সমালোচকেরা।

দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, সামরিক স্থাপনা ও বিলাসবহুল বাংলোর নিকটবর্তী এই এলাকা থেকে গত ৭ অক্টোবর উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ৭১৭টি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে রাজধানীর উপকণ্ঠে সাভদা ঘেভরা নামের একটি আবাসন এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে, যা মূল এলাকা থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে অবস্থিত। সরকারি জমিতে অবৈধ নির্মাণ ও সামরিক নিরাপত্তার অজুহাতে এসব ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলার পর মসজিদ এবং কাছের একটি হিন্দু মন্দির অক্ষত রাখা হলেও দুটিরই পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। দিল্লি প্রতিনিধি জোয়া মতিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক মসজিদ, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জীবনসংগ্রাম এবং নতুন আবাসনে তাদের নানা সংকটের চিত্র। এরপর থেকে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

উচ্ছেদ হওয়া জমিটির মালিকানা নিয়ে সরকার ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের মধ্যে চরম বিরোধ চলছে।

সরকারের দাবি, ওই জমির প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত যুক্তিতে গত আগস্টে আদালত সরকারের অবস্থান মেনে নেন। শেষ পর্যন্ত আদালত এ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করেননি এবং পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন ১৬ ডিসেম্বর।

অন্যদিকে মসজিদ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ১৯৭৭ সালে জমিটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। ইসলামী আইন অনুযায়ী ধর্মীয় বা দাতব্য কাজে উৎসর্গ করা জমি বা স্থাপনাকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি বলা হয়। বাইরে জেনারেটরের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অস্ত্রোপচারের পর তার পায়ে ধাতব রড বসানো হয়েছে।

দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের মতে, ধর্মীয় স্থাপনাটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর; যদিও অন্যান্য হিসাবে তা ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের পুরনো বলে ধারণা করা হয়।

সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ও ধ্বংসের আশঙ্কায় হাইকোর্টে রিট দায়ের হলে গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানায়, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের আপত্তি পর্যালোচনার সময় আগামী চার সপ্তাহ মসজিদটির বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

তবে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সেখানে বর্তমানে সাধারণ মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তাদের অনেকেই কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে ছিলেন। মুসল্লিদের আইনজীবী এ যুক্তির বিরোধিতা করেন।

পুনর্বাসিত এলাকা সাভদা ঘেভরা ২০০৬ সালে কৃষিজমির ওপর তৈরি করা হলেও সেখানে নাগরিক সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল। আদালতকে সরকার জানিয়েছে, সাভদা ঘেভরায় স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা এই দাবিতে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। যেমন ৬৩ বছর বয়সী বাসিন্দা নাঈম খান জানান, তাঁর দুই নাতি শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী। তাদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষা ও চিকিৎসার কোনো সুযোগ নতুন এলাকায় নেই। উচ্ছেদের ফলে নিজের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ার কথা জানিয়ে নাঈম আফসোস করে বলেন, তাদের জীবন যেন এক লহমায় ২০ বছর পিছিয়ে গেছে। স্থাপনাটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকাতেও রয়েছে। ১৯ বছর বয়সী ছেলেও নতুন এলাকায় কাজ খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে নতুন বাসার তিনতলায় ওঠানামা করাও তার জন্য কষ্টকর।

উচ্ছেদের প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মকভাবে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ ও নারীদের ওপর। আশপাশের ভিআইপি এলাকায় গৃহস্থালি কাজ, বাগান পরিচর্যা কিংবা বোতল কুড়িয়ে সংসার চালানো শত শত মানুষ কাজ হারিয়েছেন। স্বামীহারা বয়স্ক নারী আখতারি আগে পানির বোতল ও অবশিষ্ট রুটি বিক্রি করে দিনে প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন। তিনি আক্ষেপ করে জানান, সাভদা ঘেভরায় এখন সবাই দরিদ্র ও বিপর্যস্ত, ফলে কারও বাসাবাড়িতে বাড়তি কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। একইভাবে রেখা নামের এক নারী, যিনি আগে এলাকায় থালাবাসন ধোয়ার কাজ ও স্থানীয় মন্দিরে সেবা করতেন, কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তিনি বলেন, বাড়ি পেলেও তারা আসলে নিজেদের আসল ঘরটি হারিয়ে ফেলেছেন।

দীর্ঘদিনের বসতি হারিয়ে চরম যাতায়াত ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীরা। ৫০ বছর বয়সী গাড়িচালক মোহাম্মদ ওয়াসিম, যার বাবা এই মসজিদে বিয়ে করেছিলেন এবং নিজের মেয়ের বিয়েও এখানেই দিয়েছিলেন, নিরাপত্তারক্ষীদের বাধায় এখন সেখানে সহজে ঢুকতে পারেন না। অন্যদিকে রেসকোর্স এলাকার ক্লাবে কর্মরত বাবলু জানান, নতুন এলাকা থেকে সন্তানদের পুরোনো স্কুলে যাতায়াত করতে দিনে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় নষ্ট হয় এবং মেট্রো ট্রেনে তিনবার লাইন পরিবর্তন করতে হয়। সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সেখানেই তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাদের যুক্তি ছিল, কর্মস্থল, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে এত দূরে সরিয়ে নিলে তাদের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তবে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে অনুরোধ জানালে কখনো কখনো কয়েকজনকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি অনিশ্চয়তা থাকলেও সেখানে বসবাস করা পরিবারগুলোর কাছে এখন বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা জীবন থেকে হারানো কতটুকু ফিরে পাওয়া সম্ভব। ওয়াসিম বলেন, তাদের হৃদয় ও পুরো জীবন এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই এত স্মৃতি জড়িয়ে থাকা জায়গা ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য সহজ নয়। পুনর্বাসন নিয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে রেখা বলেন, কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা একটি জীবনকে কীভাবে উপড়ে নিয়ে অন্য কোথাও নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে তাঁরা শুধু কর্মসংস্থানই হারান না, দীর্ঘদিনের সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।

আবাসন ও নগর গবেষকদের মতে, দিল্লির ইতিহাসে এই ধরনের উচ্ছেদ নতুন নয়। উপযুক্ত কাগজপত্র না থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষদের শহরের মূল কেন্দ্র থেকে বহুদূরে ঠেলে দেওয়ায় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ছে। নগর গবেষক মুক্তা নায়েক উল্লেখ করেন, দূরে স্থানান্তরের ফলে যাতায়াত খরচ বেড়ে যায়, কর্মসংস্থান বন্ধ হয় এবং নিরাপত্তা ও শিশুসেবার অভাবে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিষয়ে দিল্লির আবাসন সংস্থা, পৌর কাউন্সিল ও ভূমিকার্যালয়ের বক্তব্য জানার চেষ্টা করলেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বহু প্রজন্মের স্মৃতি জড়ানো এই জনপদ হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ৭১৭টি পরিবারের বাসিন্দারা। পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থানান্তরের অনুমতি দেন। পাশাপাশি নামাজ আদায়ে বাধা এবং মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে একজন মুসল্লিও হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।