, ,

চট্টগ্রামে গণসংযোগে গুলিবর্ষণের এক বছর: অধরা সেই বাঁহাতি শুটার

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় গত বছরের ৫ নভেম্বর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী হয় স্থানীয়রা। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। এর আগে গত বছরের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় সরোয়ারের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে প্রকাশ্যে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নামের এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে তাঁকে গুলি করা হয়। সরোয়ার হত্যা মামলায় গত ২৮ অক্টোবর আদালত তাঁর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২০১৬ সালের দিকে সরোয়ার নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। এ কারণে সরোয়ার সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। এ জন্য নির্বাচনী জনসংযোগের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।

ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে বাঁ হাতে পিস্তল ঠেকিয়ে চালানো সেই গুলিতে গুরুতর আহত সরোয়ারকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার এক বছর পার হলেও সেই বাঁহাতি শুটারকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী। আলোচিত এ ঘটনার এক বছরে বাঁহাতি সেই শুটারকে যেমন গ্রেপ্তার করা যায়নি, তেমনি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও। সরোয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, তাঁর সময় শেষ।

নিহত সরোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ প্রায় ১৫টি মামলা ছিল। ঘটনার দিন তিনি বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছিলেন। হামলায় প্রার্থীর কর্মীসহ আরও পাঁচজন আহত হন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, স্লোগান ও প্রচারপত্র বিতরণের মধ্যেই অতর্কিতে হামলার ঘটনাটি ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনাকীর্ণ স্থানে বাঁ হাতে পিস্তল ধরা এক যুবক সরোয়ারের ঘাড়ে গুলি করছেন, তবে ভিডিওতে তাঁর মুখমণ্ডল স্পষ্ট ছিল না। নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ গুলির শব্দ। ওই ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। তিনি বলেন, ‘নিজের চোখের সামনে লোকজনের ভিড়ে যেভাবে ছেলেকে গুলি করে মেরেছে, তা কিছুতেই ভুলতে পারছি না।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, শুটার পেশাদার ও প্রশিক্ষিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি এবং পরিকল্পিতভাবে জনবহুল স্থানটি বেছে নেওয়ায় অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত এই মামলায় ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার কারণেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পায়নি পুলিশ। এর পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চলছিল।

সরোয়ারের বাবা ও মামলার বাদী আবদুল কাদের জানিয়েছেন, হত্যার তিন দিন আগে ‘সন্ত্রাসী’ মো. রায়হান তাঁকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিল।

রায়হান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী এবং ছোট সাজ্জাদ প্রায়ই তাঁকে ভয় দেখাতেন। পরে গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

আবদুল কাদের বলেন, নিজ এলাকায় এমন হামলার আশঙ্কা ছিল না বলেই সরোয়ার অসতর্ক ছিলেন।

মামলাটিতে বিদেশের পলাতক সাজ্জাদসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার প্রধান আসামিদের মধ্যে রায়হান ও সাজ্জাদ এখনো পলাতক থাকলেও চলতি বছরের ২৯ আগস্ট মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়।

নিহতের ছোট ভাই আজিজ উদ্দিনের দাবি, এটি নিছক আধিপত্যের লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। তাঁর অভিযোগ, সরোয়ার বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হওয়ায় দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার হয়েছেন। বড় সাজ্জাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে—এমন কোনো প্রভাবশালী নেতা এতে জড়িত থাকতে পারেন বলে তিনি আশঙ্কা করেন। এদিকে, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আজিজ উদ্দিন বলেন, অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও আসল অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। যদিও নেপথ্যে রাজনৈতিক বিরোধও থাকতে পারে বলে ধারণা পরিবারের। পুলিশের ধারণা, ওই শুটারের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ভালোভাবে প্রশিক্ষিত কেউ এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সরোয়ার একসময় বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন।

ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন অবশ্য নিরীহ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং বাঁহাতি শুটারকে চিহ্নিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত ৩৯ জনের মধ্যে ১০ জন কারাগারে রয়েছেন। সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। ছেলের মৃত্যুর এক বছর পরও শুটার গ্রেপ্তার না হওয়ায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাদী আবদুল কাদের। আবার গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন প্রকৃত আসামি জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।