সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের ৬৫ জন সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। রোববার দুপুরে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের উপস্থিতিতে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। একসময় সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
এসআরবি-১২ এর তথ্য অনুযায়ী, আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে পাবনার ৪৫ জন, রাজবাড়ীর ১৩ জন এবং সিরাজগঞ্জের ৭ জন রয়েছেন। তারা অতীতে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ও নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন নামে সক্রিয় থাকলেও তাদের সবার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। নাম ভিন্ন হলেও তাঁরা সবাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেন, যারা ভুল বুঝে চরমপন্থী পথে পা দিয়েছিলেন, তারা আজ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আলোর পথে ফিরে আসছেন। সরকার তাদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের জন্য সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবে। তিনি জানান, অন্ধকার জগতে থাকা ব্যক্তিদের মূলধারায় ফেরাতে একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে এই অঞ্চলের সদস্যদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান খোঁজা হবে। এসআরবির সদস্যদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। এ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চল ভেদে চরমপন্থী সংগঠনে যুক্ত ব্যক্তিদের নানা সমস্যা আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হবে। তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন থানায় লুণ্ঠিত অস্ত্রের বিষয়ে আত্মসমর্পণকারীরা কোনো তথ্য দিতে পারলে এসআরবিকে সহায়তা করতে হবে। অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। মামলার বিচারও দ্রুত শেষ করা হবে।
এসআরবি-১২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, আত্মসমর্পণকারী অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি ও বিস্ফোরক দ্রব্যসহ নানা অপরাধে মামলা রয়েছে। এসব মামলা পর্যালোচনা করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে এবং আইনি জটিলতা নিরসনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘ ১৭ বছরের নানা জটিলতা ও সমস্যা সমাধানে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কথাও জানান তিনি। এসআরবি-১২–এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান, এসআরবির মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্। এসআরবি-১২–এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান, এসআরবির মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার।
আত্মসমর্পণকারী সালমান শাহ জানান, দুই ভাই একসঙ্গে অন্ধকার পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে আনন্দিত। পাবনার বাবু মিয়া জানান, চরমপন্থার ভুল পথে তার জীবনের ১৫টি বছর নষ্ট হয়েছে। এখন তিনি পরিবার নিয়ে শান্তিতে বাঁচতে চান। এছাড়া মাজেদ আলী মুন্সী ও আলমগীরের মতো সদস্যরা জানিয়েছেন, জীবিকার অভাবে অনেক সময় তারা দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা এখন পুরোপুরি পরিহার করতে চান। এভাবে তাঁর জীবন থেকে ১৫ বছর চলে গেছে। আলমগীর নামের আরেকজন বলেন, ‘আমরা একেক সময় একেক জায়গায় থাকতাম। যখন নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস পেতাম না, তখন অনেককে দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তেন।’। এতে এলাকাগুলোতে চরমপন্থীদের তৎপরতা অনেক কমে এসেছে।
উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশকের শেষে ১৯৯৮ সালে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে শতাধিক সদস্যের আত্মসমর্পণের পথ প্রশস্ত হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনায় ৫৯৬ জন এবং ২০২৩ সালের ২১ মে সিরাজগঞ্জে আরও ৩২৩ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তিন জেলার ৬৫ জন চরমপন্থী সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে শামিল হলেন।