আজ বুধবার, ২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

রক্তাক্ত তল্লা, খুনী কারা

সংবাদচর্চা রিপোর্ট:

৬৫ বছর বয়স্ক কুদ্দুস বেপারীর মৃত্যু যেন কিছুতেই মানতে পারছিলেন না তার চার মেয়ে। মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে বিলাপ করছিলেন তারা। পাশের বাড়ির ভাড়াটে গার্মেন্টসকর্মী ইব্রাহিমের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে। সন্তানদের লেখাপড়া করে মানুষ করার খুব ইচ্ছে ছিলো ইব্রাহিমের। পারুল বেগম বাড়ি বাড়ি আরবী পড়িয়ে দুই ছেলেকে কলেজ পর্যন্ত নিয়েছেন। শত কষ্টের মধ্যেও স্বপ্ন দেখতেন, সন্তানরা শিক্ষিত হলে ভালো আয় করবে তখন তাঁর সব দুঃখ কষ্ট দূর হবে। তবে পারুল বেগমদের সব স্বপ্ন মূহুর্তেই ধুলিস্যাত করে দিয়েছে একটি ভয়ংকর বিস্ফোরণ। পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে শুক্রবার এশা’র নামাজ চলাকালিন বিস্ফোরনে অগ্নিদ্বগ্ধ হন অন্তত ৫৫ জন। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তবে সচেতন মহল বলছে, এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। এ হলো খুন ! তবে প্রশ্ন উঠেছে, কারা খুনী ? কারা তল্লা এলাকার এতগুলো প্রাণ ঝড়ালো।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকার ১১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে শুক্রবার এশা’র নামাজ আদায় করছিলেন মুসুল্লিরা। ফরজ শেষ করে সুন্নাত পড়ছিলেন তারা। তখনই বিকট শব্দ আশপাশের মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মসজিদের ভেতর থেকে হঠাৎ আগুনের একটি শিখা বের হতে দেখা যায়। তখন বিদ্যুত চলে যায়। মসজিদের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসে। বাঁচাও বাঁচাও বলে আকুতি করতে থাকে মুসুল্লিরা। পরে ফায়ার সার্ভিস টিম এসে মুসুল্লিদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এ সময়ে এলাকাবাসীও তাদের সহযোগীতা করে। প্রথম দিকে শোনা যায়, মসজিদের ভেতর থাকা ৬টি এসি বিস্ফোরণ হয়েছে। পরে শোনা যায় মসজিদের পাশে গ্যাস লাইনের একাধিক লিকেজ থেকে এর সূত্র।

বিস্ফোরনে যারা মারা গেলেন:

বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত মারা গেছেন, মসজিদের মোয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৮) ও তাঁর ছেলে জুনায়েদ (১৭), দুই ভাই জোবায়ের (১৮) ও সাব্বির (২১), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), চাঁদপুরের মোস্তফা কামাল (৩৪), পটুয়াখালীর গার্মেন্টস কর্মী রাশেদ (৩০) হুমায়ুন কবির (৭২), পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর জামাল আবেদিন (৪০), গার্মেন্টস কর্মী ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), নারায়ণগঞ্জের কলেজ শিক্ষার্থী মো. রিফাত (১৮), চাঁদপুরের মাইনুউদ্দিন (১২), ফতুল্লার জয়নাল (৩৮), লালমনিরহাটের গার্মেন্টসকর্মী নয়ন (২৭), নারায়ণগঞ্জের রাসেল (৩৪), খুলনার কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), শিশু জুবায়ের (৭) এবং বাহার উদ্দিন (৫৫), আবদুল মালেক (৬২) ও মিজান হোসেন নিজাম (৪০)।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার বক্তব্য:

ফায়ার সার্ভিসের নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আরেফিন বলেন, লিকেজ থেকে জমে থাকা গ্যাস মসজিদের ভেতরে জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, মসজিদের মেঝের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন গেছে। তাঁরা পানি দেওয়ার সময় মেঝে থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠছিল। এসি চালানের কারণে জানালা বন্ধ থাকায় গ্যাস ভেতরে জমা হয়ে ছিল। এরপর হঠাৎ করে বিদ্যুতের স্পার্ক থেকে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

পুলিশ সুপার:

প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে দুর্ঘটনা মনে করছেন পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। তিনি বলেন, ‘সেখানে নাশকতা বা অন্য কোনো কিছুর আলামত আমরা পাইনি। তবওু সিআইডি ফরেনসিক ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ:

একাধিক মুসল্লি বলেন, তাঁরা মসজিদে নামাজ আদায় করতে গেলে গ্যাসের গন্ধ পেতেন। এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের এই লিকেজের সমস্যা চলছে। একজন জানালেন, শুক্রবার জুমআর নামাজের সময়েও গ্যাসের দুর্গন্ধ পেয়েছেন।
গ্যাস লিকেজের বিষয়টি নিয়ে মসজিদ কমিটি অবহেলা করেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টির পর থেকে গ্যাসের বুদ বুদ দেখা দেয়। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মসজিদ কমিটিও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।
পশ্চিম তল্লা এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহেল শেখ বলেন, ‘আগে থেকেই মসজিদের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ পেতাম। এসি চালানোর কারণে মসজিদের দরজা-জানালা বন্ধ থাকত। ভেতরে গ্যাস জমে গিয়েছিল।’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় ইসলামি কাফেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সামছুজ্জামান ভাসানী বলেন, বিস্ফোরণে মসজিদের ভেতরে থাকা মুসল্লিদের কেউ অক্ষত পোশাক নিয়ে বের হতে পারেননি। তিনি বলেন, এই এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে গ্যাসের লিকেজ সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোন সুরাহা হয়নি।

তিতাসের উপমহাব্যবস্থাপক:

অভিযোগের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস গ্যাসের লিকেজের অভিযোগ পেয়ে তাদের একটি দল কাজ করছে। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

মসজিদ কমিটির অবহেলা:

মসজিদ কমিটির অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি ও ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবদুল গফুর বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। সপ্তাহ খানেক আগে গ্যাস লিকেজের বিষয়টি তারা তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের ঠিকাদারকে জানান। তখন ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। টাকা জোগাড় করার আগেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
এদিকে এ ঘটনায় পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে রিপোর্ট দিবে কার দোষী। বিকেলে বিদ্যুত ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রি নসরুল হামিদ বিপু ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার সময়ে বলেন, তিতাস কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগের কারও কোন গাফলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযোগ, তদন্ত কমিটি আর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস এলেও তল্লা এলাকায় কান্না থামেনি। পশ্চিম তল্লার ওই মসজিদের আশপাশের বাড়িগুলোতে এখন শোকের মাতম চলছে। স্বজন ও আপনজন হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়ে পরেছে মানুষগুলো। সন্তান হারিয়ে বাবা-মা কাঁদছে, বাবা হারিয়ে সন্তানরা বিলাপ করছে। স্বামী হারিয়ে শোকে পাথার হয়ে গেছে স্ত্রী। তাদের যে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতিপূরণ কোনভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন সচেতন মহল। তাদের মতে, এ দুর্ঘটনা কোন স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়। অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারনেই মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটেছে। কারও না কারও অবহেলায় মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে এ মানুষগুলোকে। যাকে খুনের শামিল বলে মনে করেন তারা।

এ ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, এমপি শামীম ওসমান, সাবেক এমপি আবুল কালাম, বিএনপি নেতা এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার, সাখাওয়াত হোসেন খান সহ অনেকে।

শনিবার বিকেল ৩টা থেকে বিস্ফোরণে মৃত ১৬ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক ও জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরী উপস্থিত থেকে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ