ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত আগস্ট থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক লড়াইয়ে অন্তত ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সংস্থা ওসিএইচএ। বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৬ হাজার ১০০ জন অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬০০ জনের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির পর সম্প্রতি আবার সংঘাত শুরু হয়।
দেশটির পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের অনুগত বাহিনী এবং ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তাইজ প্রদেশ ও বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা। সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে অবস্থান করা ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির দামও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শুক্রবার প্রকাশিত ওসিএইচএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে থাকা ৬৫ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।
বাস্তুচ্যুতদের সহায়তায় জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল দল ও ধাত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষের কাছে খাদ্য, জরুরি নগদ অর্থ এবং স্বাস্থ্যবিধি উপকরণ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে, যা বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশ। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এতে সরকার দক্ষিণাঞ্চলে সরে যেতে বাধ্য হয়।
সংঘাতের তীব্রতা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবেও ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, রিয়াদের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এর আগের দিন শুক্রবার মক্কা, মদিনা ও রিয়াদের কাছে ড্রোন এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। যদিও হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং একে মিথ্যা দাবি করেছেন। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে। তিনি এসব অভিযোগকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার মাধ্যমে ‘বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে’ অকার্যকর করার চেষ্টা করছে বলে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। গোলাবর্ষণ ও গুলিতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ মা’আশিক এবং এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। এই প্রাসাদই দেশটির অন্তর্বর্তী রাজধানীতে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনার কেন্দ্র।
মন্ত্রিসভা এই হামলাকে জনস্বার্থ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগে গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। এর আগে হুথিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেরামতের জন্য বিমানবন্দরটি সাময়িক বন্ধ ছিল।
সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মেজর মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি দাবি করেছেন, বিভিন্ন ফ্রন্টে তাদের অভিযানে হুথিদের প্রায় ৩৩৬ জন যোদ্ধা ও কমান্ডার নিহত হয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাইজ প্রদেশে হুথিদের অভিযানে অন্তত ১৮৯ জন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৮টি শিশু ও ২৭ জন নারী রয়েছেন। এ ছাড়া ১১২টি যানবাহন, অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তার ভাষ্য, তাইজ, মারিব, আল-জাওফ ও আল-বাইদাসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের কমান্ড সেন্টার, সেনা সমাবেশ ও সরবরাহ রুট লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান ও রকেট লঞ্চার ব্যবহার করা হয়েছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, এই সময়ে ২৩টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও তিন শতাধিক অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংঘাতের ফলে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ২০ লাখ মানুষের কাছে খাদ্য, পানি, ওষুধ ও জ্বালানি পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি বাহিনী রাজধানী সানা দখল করলে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সরকারপন্থি বাহিনীকে সহায়তা দিতে সামরিক অভিযানে নামে। সম্প্রতি সানা বিমানবন্দর লক্ষ্য করে সরকারি হামলার পর হুথিরা উপকূলজুড়ে পাল্টা অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যায়। তবে সৌদি রাজধানী, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দায় তারা স্বীকার করেছে। চলতি মাসে শহরটির দক্ষিণে আল-তুরবাহসহ কয়েকটি এলাকা দখলে নেওয়ার পর হুথিরা তাইজকে আরো শক্তভাবে ঘিরে ফেলেছে।
এদিকে, সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সময় তিনি কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সঙ্গে হুথিদের হামলার যৌথ নিন্দা জানান।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে ২৭০ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৬৮ জন নিহত হয়েছেন এবং নিহতদের অর্ধেকই শিশু। সরকারি ও বিদ্রোহী—উভয় পক্ষই এখন নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নতুন করে এলাকা পুনর্দখল ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।