ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ সম্প্রতি ব্যালন ডি’অরের পয়েন্ট তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানের ভোটদান পদ্ধতির ইতিহাসে সবচেয়ে কম পয়েন্টের ব্যবধানে বর্ষসেরার এই খেতাব জিতেছেন ইংল্যান্ডের ফরোয়ার্ড হ্যারি কেইন। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কিলিয়ান এমবাপ্পেকে মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে পেছনে ফেলে পুরস্কারটি নিজের করে নেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’ জানিয়েছে, ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছরের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বনিম্ন ভোট ব্যবধানে এবার পুরস্কারটি জিতেছেন কেইন।
জুরি বোর্ডের ১০০ জন সাংবাদিকের তালিকায় ৪০ জনের কাছ থেকে প্রথম স্থান পান হ্যারি কেইন। এর মাধ্যমে সব মিলিয়ে তাঁর ঝুলিতে জমা হয় ১,০৫৫ পয়েন্ট। অপরদিকে ২৩ জন বিচারকের পছন্দের শীর্ষস্থানে থাকা ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে পান ১,০২৭ পয়েন্ট। এর আগে ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েন ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই খেতাব জিতেছিলেন; দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর ফের কোনো ইংলিশ তারকা এই গৌরব অর্জন করলেন। মাও সে–তুংকে নিয়ে রসিকতাসূচক মন্তব্য করে চীনের বিরাগভাজন হয়েছেন এমবাপ্পে।
ভোটের ব্যবধানের দিক থেকে এটি একটি বড় রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ৪১ পয়েন্টে হারিয়ে রদ্রি ব্যালন ডি’অর জয় করেছিলেন, যা ছিল আগের সর্বনিম্ন ব্যবধানের রেকর্ড। তবে সামগ্রিক ইতিহাসের বিচারে এটি চতুর্থ সর্বনিম্ন ব্যবধান। এর আগে ২০১৯ সালে লিওনেল মেসি মাত্র ৭ পয়েন্টে ভার্জিল ফন ডাইককে পেছনে ফেলে পুরস্কার জেতেন। গত বছর উসমান দেম্বেলে ১,৩৮০ পয়েন্ট পেয়ে শীর্ষ স্থান দখল করেছিলেন এবং লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে তাঁর ব্যবধান ছিল ৩২১ পয়েন্টের।
এবারের আসরে স্পেনের তারকা লামিনে ইয়ামাল ৮৮১ পয়েন্ট পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন, যেখানে ১৩ জন সাংবাদিক তাঁকে প্রথম স্থান দেন। ৭২৬ পয়েন্ট অর্জন করে চতুর্থ স্থানে থাকেন তাঁর ক্লাব ও জাতীয় দল সতীর্থ রদ্রি, যিনি ১০ জন সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রথম পছন্দ হিসেবে ভোট পেয়েছিলেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে পুরুষ ফুটবলে শীর্ষ ১০০ এবং নারী ফুটবলে শীর্ষ ৫০ দেশের একজন করে প্রতিনিধি সাংবাদিক এই ভোটিং প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। ২০২২ সাল থেকে ক্যালেন্ডার বছরের পরিবর্তে ফুটবলের পুরো একটি মৌসুমের পারফরম্যান্সকে মূল্যায়নের ভিত্তি ধরা হয়। কেইনের চেয়ে ১৭৪ পয়েন্ট কম পাওয়া ইয়ামাল ১৩ জন সাংবাদিকের কাছে ভোটে প্রথম স্থান অর্জন করেন। বর্তমান এই ভোটের পদ্ধতি চালু করা হয় ২০২২ সালে এবং নিয়ম পরিবর্তন করে সে বছরের পর থেকে বর্ষপঞ্জির বদলে মৌসুমের পারফরম্যান্সকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশ্বকাপে এমবাপ্পের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ানো প্যারাগুয়ের প্রতিনিধি তাঁকে ভোটে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন।
পয়েন্ট বণ্টনের নিয়মানুসারে, প্রথম পছন্দের খেলোয়াড় পান ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী ১২ পয়েন্ট এবং তৃতীয় স্থানের অধিকারী ১০ পয়েন্ট পেয়ে থাকেন। বাকিদের জন্য যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ এবং ১ পয়েন্ট নির্দিষ্ট করা থাকে। এবারের বিচারে বিশ্বজুড়ে কেইনের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা দেখা গেছে। ফিফার শীর্ষ ১০০ দেশের ভোটারদের মধ্যে শুধু মেক্সিকো ও আইভরি কোস্টের প্রতিনিধিরা তাঁকে নিজেদের সেরা দশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেননি।
অন্যান্য খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও কিছু বৈচিত্র্যময় ভোটিং পরিসংখ্যান দেখা গেছে। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে সেরা দশের বাইরে রাখেন গ্রিস, স্কটল্যান্ড ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা। বেলারুশ, ক্যামেরুন, ক্রোয়েশিয়া ও গ্রিস তাদের শীর্ষ দশের তালিকায় ইয়ামালকে রাখেনি। অন্যদিকে, প্রথম স্থানসূচক ১০টি ভোট পাওয়া রদ্রিকে শীর্ষ পছন্দ হিসেবে বেছে নেয় নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, সার্বিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া ও আইসল্যান্ড। তালিকায় দশম স্থানে থাকা স্পেনের ফাবিয়ান রুইজ গ্যাবন, পেরু, সিরিয়া ও ইউক্রেন থেকে প্রথম স্থানসূচক ভোট পান।
পাঁচ নম্বরে থাকা লিওনেল মেসি প্রথম স্থানসূচক ভোট পান ছয়টি দেশ থেকে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পানামা, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন। উল্লেখ্য, চীনের প্রতিনিধি এমবাপ্পেকে পঞ্চম পছন্দ হিসেবে রাখলেও প্যারাগুয়ের প্রতিনিধি বিতর্ক সত্ত্বেও তাঁকে তৃতীয় স্থানে রাখেন। সমগ্র আফ্রিকার ২০টি দেশের মধ্যে ৯টির প্রতিনিধিই প্রথম পছন্দের তালিকায় এমবাপ্পেকে স্থান দিয়েছেন।
গত বছরের বিজয়ী উসমান দেম্বেলে এবার কোনো দেশ থেকেই প্রথম স্থানসূচক ভোট পাননি। তবে সপ্তম স্থানে শেষ করা এই তারকা বুরকিনা ফাসো, চীন, ফ্রান্স, জর্জিয়া, হাইতি, উত্তর মেসিডোনিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে দ্বিতীয় স্থানসূচক ভোট লাভ করেন। ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ডও কোনো প্রথম স্থান পাননি, তবে ক্রোয়েশিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও নরওয়েতে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। এক ব্যতিক্রমী ঘটনায়, ফরাসি তরুণ মাইকেল ওলিসে কেবল কুরাসাওয়ের প্রতিনিধির কাছ থেকে একটিমাত্র প্রথম স্থানসূচক ভোট পান।
নারী ফুটবলেও ব্যালন ডি’অরের লড়াই ছিল বেশ আকর্ষণীয়। বার্সেলোনার প্রাক্তন সতীর্থ ইভা পাযোরকে ৮৬ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়ে নিজের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতেছেন আলেক্সিয়া পুতেয়াস। লন্ডন সিটি লায়নেসেসে খেলা পুতেয়াস মোট ৬১৮ পয়েন্ট অর্জনের পথে ৫০ জন বিচারকের মধ্যে ২৮ জনের প্রথম পছন্দ ছিলেন। ৫৩২ পয়েন্ট পেয়ে দ্বিতীয় হন ইভা পাযোর এবং ৩৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করেন ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ। হার না–মানা এক রানির বার্সেলোনা থেকে লন্ডন জয়।