, ,

একসময়কার আতঙ্ক, এখন আলোচনার ভিন্ন চরিত্র—জাকির খানের বদলে যাওয়া অধ্যায়

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত-সমালোচিত একটি নাম জাকির খান। একসময় শহরের রাজপথে সংঘাত-সংঘর্ষ, রাজনৈতিক আধিপত্য ও নানা বিতর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসা এই ব্যক্তি জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন আত্মগোপনে, প্রবাসে ও কারাগারে। হত্যা মামলার আসামি হওয়া, দেশত্যাগ, প্রায় দুই দশক পর দেশে ফেরা এবং অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ কারাবাস—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন নানা নাটকীয় বাঁক অতিক্রম করেছে।

তবে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল কারামুক্তির পর নারায়ণগঞ্জে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। অতিতে যাকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা ছিল, সেই জাকির খানকে মুক্তির পর থেকে আগের মতো সংঘাতকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে না বলে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে আলোচনা রয়েছে। বরং তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ, কথাবার্তা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একসময়কার আগ্রাসী ও সংঘাতপ্রবণ ভাবমূর্তির সঙ্গে বর্তমান উপস্থিতির এই পার্থক্য নিয়েই এখন নানা প্রশ্ন।

জাকির খানের বাবা দৌলত খান। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে নারায়ণগঞ্জ শহরাঞ্চলে দৌলত খানের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। শহরের দেওভোগ এলাকায় তাঁদের আদি নিবাস।

কৈশোর থেকেই জাকির খান ছিলেন বন্ধুপ্রিয়, আনন্দপ্রিয়, আবেগপ্রবণ ও সাহসী স্বভাবের। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, আনন্দ-উল্লাস এবং বিভিন্ন ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ছিল তাঁর মধ্যে। সমসাময়িকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মারামারি ও সংঘাতেও তিনি সহজেই জড়িয়ে পড়তেন।

তাঁর শৈশব-কৈশোরের পরিচিতজনদের অনেকে মনে করেন, দীর্ঘদিন কারাগার ও আত্মগোপনে থাকার কারণে তাঁর চলাফেরা ও শারীরিক ভাষায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা ও আনন্দ করার প্রবণতা এখনো রয়েছে।

১৯৮৯ সালে প্রয়াত সংসদ সদস্য এ কে এম নাসিম ওসমানের হাত ধরে জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজের রাজনীতিতে যুক্ত হন জাকির খান।

নব্বই দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নম্বর রেলগেট, ডিআইটি ও আশপাশের এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৎকালীন আলোচিত নিনজা গ্রুপের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে শহরজুড়ে আলোচনায় আসেন জাকির খান।

তখন তিনি নাসিম ওসমানের রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

এর পেছনে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি তাঁর ছোট ভাই মামুন খানকে মারধরের ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে স্থানীয় সূত্রগুলো উল্লেখ করে।

জানা যায়, শহরের নন্দীপাড়া এলাকায় এক ঘটনায় মামুন খানকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এ ঘটনায় জাকির খান নাসিম ওসমানের কাছে বিচার চেয়েছিলেন। কিন্তু একাধিকবার জানানোর পরও সমাধান না হওয়ায় কালীরবাজারের জাতীয় পার্টি কার্যালয়ে নাসিম ওসমানের সঙ্গে তাঁর তর্ক হয়। পরে তৎকালীন জাতীয় পার্টি নেতা এম হোসাইন সাঈদের মধ্যস্থতায় ঘটনা বেশী দুর আগায়নি বলে জানা যায়।
মামুন খানকে মারধরের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে জাকির খান চাষাড়ার খাজা সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডারত অবস্থায় গোলাম সারোয়ারকে লক্ষ্য করে গুলি করেন বলে সে সময়ের স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত রয়েছে। ওই ঘটনায় গোলাম সারোয়ার প্রাণে বেঁচে যান।

গোলাম সারোয়ার ছিলেন তৎকালীন ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ফলে এ ঘটনার পর জাকির খানের সঙ্গে ওসমান বলয়ের বিরোধ আরও তীব্র হয়।

১৯৯৪ সালে প্রয়াত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরীর মাধ্যমে জাকির খান বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। যোগদানের পর জাকির খান বেশ আগ্রাসী হয়ে উঠে। হঠাৎ হঠাৎ গোলাম সারোয়ার ও তার সহোযোগিদের আড্ডাস্থল চাষাড়াস্থ খাজা সুপার মার্কেট ও স্বান্তনা সুপার মার্কেটের সামনে এসে বোমা বর্ষণ ও গুলি করে আতংক ছড়াতো বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।
১৯৯৫ সালের দিকে দেওভোগ এলাকার আলোচিত ব্যক্তি মাসুদ ওরফে দয়াল মাসুদকে গুলশান সিনেমা হলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নারায়ণগঞ্জ শহরে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

ঘটনাটি সে সময় শহরের অপরাধজগত ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাকির খানের নামও ওই সময়ের সংঘাতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক আলোচনায় বারবার উঠে আসে।
বিএনপি সরকারের পতনের পর তিনি গ্রেপ্তার হন। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত জাকির খান বাহিনীর সাথে প্রকাশ্যে একাধিকবার বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে।

গ্রেপ্তারের পর কয়েক বছর কারাগারে থাকার একপর্যায়ে ১৯৯৮ সালের দিকে তিনি মুক্তি পান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

সে সময় আদালতে হাজিরার জন্য তাঁকে কালীরবাজারের পুরোনো আদালতে আনা হতো। তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পথে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছিল—এমন খবরও তখন স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়। তবে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বিষয়টি জেনে যাওয়ায় সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ফলে তাকে বেশ কয়েক মাস নারায়নগঞ্জ আদালতে নিয়ে
আসা হয়নি।

১৯৯৯ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হন। এর মধ্য দিয়ে শহরের দেওভোগ এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।

২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরও জাকির খানের রাজনৈতিক জীবন নির্বিঘ্ন ছিল না। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বিভিন্ন মামলা ও বিরোধের কারণে তাঁকে আত্মগোপনে থাকতে হয়।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী নেতা ছাব্বির আলম খন্দকার হত্যাকাণ্ড। সে হত্যাকান্ডের পরপর পুলিশ জাকির খানকে গ্রেফতার করতে গিয়ে তাকে না পেয়ে পরিবারের একাধিক সদস্যদের আটক করে থানায় নিয়ে যান। পরে অবশ্য তাদের কে থানা থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিলো।

সেদিন সকালে প্রাতর্ভ্রমণে বের হলে মাসদাইরের শেরেবাংলা সড়কে নিজ বাড়ির অদূরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ছাব্বির আলম খন্দকার। তিনি নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সহসভাপতি এবং তৎকালীন বিআরটিসির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই ছিলেন।

ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই তৈমূর আলম খন্দকার বাদী হয়ে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানসহ কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

মামলার পর জাকির খান আত্মগোপনে চলে যান। প্রথমে থাইল্যান্ডে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে ভারত হয়ে দেশে ফেরেন।

দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের পর ২০২২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে জাকির খানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১১। এ সময় তাঁর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাবের তৎকালীন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর মাহমুদ পাশা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, জাকির খানের বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালের সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন আইনের একটি মামলায় প্রথমে ১৭ বছরের সাজা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে তা কমে আট বছর হয়। র‌্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার পর তিনি দেশত্যাগ করেন এবং দীর্ঘ সময় থাইল্যান্ডে অবস্থান করেন। পরবর্তীতে তিনি ভারত কিছুদিন অবস্থানের পর দেশে ফিরে আসেন।গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়। শুরু হয় দীর্ঘ কারাবাসের আরেক অধ্যায়।

জাকির খান কারাগারে থাকলেও নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর নাম আলোচনার বাইরে ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর অনুসারীদের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

বিশেষ করে পরিবহন, ঝুট ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সামনে আসে।

২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সিটি বন্ধন পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাকির খানের অনুসারীদের সঙ্গে মহানগর বিএনপির সদস্য মাহবুবুল্লাহ তপনের ভাগিনা সাখাওয়াত ইসলাম রানার সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হন বলে সে সময়ের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

ঘটনার পর পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়।
দীর্ঘ কারাবাসের অবসান ঘটে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান জাকির খান।

এর আগে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি ২২ বছর আগের আলোচিত সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালত তাঁকে এবং মামলার অন্য আসামিদের খালাস দেন।

কারামুক্তির সময় তাঁর আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাজীব মণ্ডল গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, জাকির খানের বিরুদ্ধে থাকা ৩৩টি মামলার মধ্যে ৩২টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। বাকি একটি মামলায় সাজা ভোগের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মুক্তি পেয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের তৎকালীন জেল সুপার মোহাম্মদ ফোরকান ওয়াহিদও সাজার মেয়াদ শেষে তাঁর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সকাল থেকেই কারাগারের সামনে ফুলের মালা ও গাড়িবহর নিয়ে অপেক্ষা করেন অনুসারীরা। তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। পরে শহরে গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন করেন।

জাকির খানের মুক্তির আগে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে বিসিক শিল্পাঞ্চলের ঝুট ব্যবসা, পরিবহন খাত এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সংঘাত তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে।

কারণ, অতীতে এসব খাতের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে একাধিক সংঘর্ষ ও বিরোধের ঘটনা ঘটেছে। জাকির খানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচিতি, অনুসারী এবং অতীতের সংঘাতের ইতিহাস বিবেচনায় তাঁকে ঘিরে নতুন করে আধিপত্যের লড়াই শুরুর আশঙ্কা ছিল।

এমনকি বিসিক ঝুট খাতে প্রভাবশালী এক তরুন নেতার মধ্যেও তাঁকে নিয়ে উদ্বেগের আলোচনা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

কিন্তু কারামুক্তির পর এখন পর্যন্ত অতীতের মতো বড় ধরনের সংঘাতকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসেনি। বরং নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারবাজি ও ব্যবসায়িক খাতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আলোচনায় এলেও জাকির খানের নাম সেসব আলোচনায় নেই বললেই চলে।

কারামুক্তির পর জাকির খানের ব্যক্তিগত আচরণ, কথাবার্তা ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেউ তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে হাস্যরসাত্মক মন্তব্য করছেন, কেউ আবার ব্যঙ্গাত্মক টিকটক ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এমনকি কেউ কেউ তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলেও মন্তব্য করছেন।

তবে তাঁর শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের ভাষ্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, জাকির খান ছোটবেলা থেকেই আনন্দপ্রিয়, রসিক ও বন্ধুদের সঙ্গে মজা করতে পছন্দ করতেন। বড়দের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করার প্রবণতাও তাঁর মধ্যে ছিল।
তাঁদের ধারণা, জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগার ও আত্মগোপনে কাটানোর কারণে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ও চলাফেরায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে কৈশোরের সেই দুরন্তপনা ও আনন্দপ্রিয় স্বভাব এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

অন্যদিকে জাকির খানের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর, শীর্ষ চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী এবং আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বান্টিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।বিভিন্ন সময় জাকির খানের সফরসঙ্গী হিসেবেও বান্টিকে দেখা যায় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

তিন দশকের ও বেশী সময় ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জাকির খান একটি আলোচিত নাম। নব্বইয়ের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে সংঘাত, রাজনৈতিক বিরোধ, হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হওয়া, দীর্ঘ প্রবাসজীবন, গ্রেপ্তার এবং কারাবাস—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে নানা বিতর্ক ও নাটকীয়তা।

তবে ২০২৫ সালে কারামুক্তির পর তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে যে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা অতীতের পরিচিতির সঙ্গে অনেকটাই ভিন্ন।

একসময় তাঁর নাম শুনলে সংঘাতের আশঙ্কা করতেন অনেকে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে হাস্যরস, ব্যঙ্গ ও নানা মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তাঁর পরিবর্তিত আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি দীর্ঘ কারাবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আসা স্বাভাবিক পরিবর্তন, নাকি সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল?

তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, অতীতের সংঘাত ও আধিপত্যের রাজনীতির পরিবর্তে আইন মেনে চলা, সামাজিক শান্তি বজায় রাখা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখবেন জাকির খান। কারণ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের প্রভাব নয়, একজন মানুষের বর্তমান কর্মকাণ্ডই শেষ পর্যন্ত তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।