, ,

আইজিপির ক্রসফায়ার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ টিআইবি ও মানবাধিকার সংস্থা অধিকার

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন যে, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতে পিছপা হবে না। এই বক্তব্যের কড়া নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। টিআইবি মনে করে, এই ধরনের বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতাকে ঢাকার একটি প্রচেষ্টা এবং এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি অশনি সংকেত। অধিকার এই ধরনের বক্তব্যের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

এক বিবৃতিতে টিআইবি আইজিপির এই বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার, এ বিষয়ে তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত এবং প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটাতে না পেরে প্রধান যদি ক্রসফায়ারকে সমাধান হিসেবে দেখেন, তবে তা চরম পেশাগত দেউলিয়াত্ব। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্ট করেন, পুলিশের মূল দায়িত্ব হলো পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করে তাকে আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, জীবনের অধিকার ও আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করার সুযোগ নেই। তিনি অতীতে সিনহা হত্যা মামলা, কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধ এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এসব ঘটনা পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়াবহতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথ বেছে নেবে না। অথচ আইজিপি কেন এমন বিপরীতমুখী ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য দিলেন, তার ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি দাবি করেছে টিআইবি। তিনি আরও বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল। পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন বৈধ সমালোচনা এড়ানোর যুক্তি হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য।

সংস্থাটি আরও জানায়, পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত ও আনুপাতিক হতে হবে। সাংবাদিকের সমালোচনাকে অপরাধের সাথে গুলিয়ে ফেলাও মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য হুমকি। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, কিন্তু ঢালাও অভিযোগ স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করে। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।

অন্যদিকে, মানবাধিকার সংস্থা অধিকার তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের শাসনামলে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের ব্যাপক নজির রয়েছে। পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার এই মন্তব্য মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত সদস্যদের জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরোক্ষ ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ পর্যন্ত অন্তত ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র‌্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে।

হাসিনা সরকারের আমলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইতিমধ্যে অনেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্যকে চরম উদ্বেগের বলে অভিহিত করেছে অধিকার। তারা অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহার এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে। ঐ সময়ে ভিন্নমভাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতা কর্মী সহ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন।