রাঙামাটির সাজেকে টানা সাত দিন ধরে চলছে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। বুধবার সকাল থেকেও সাজেক সড়কে কোনো ধরনের যান চলাচল করেনি। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত বৃহস্পতিবার থেকে এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। এটি সংগঠন দুটির তৃতীয় দফার অবরোধ। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে, যার ফলে পর্যটকেরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। ১০ নম্বর হাজাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সমর্থনে আজ বুধবার পিকেটাররা অবস্থান করছেন। সুনসান সাজেক, চতুর্থ দিনে গড়াল অবরোধ। নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে ফিরেছেন পর্যটকেরা, হোটেল না পেয়ে ভোগান্তি। সাজেকে অবরোধ: মূল সমস্যা যেভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
অবরোধের প্রভাবে সাজেক এলাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানান, এলাকার বাসিন্দারা ঘরে থাকা সামান্য মজুত খাবার দিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি দোকানের পণ্যও শেষের দিকে। অবরোধ পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন চললে এলাকায় খাদ্যসংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বছরের এই কয়েক মাসই তাঁদের আয় করার সময়। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিন পর না খেয়ে থাকতে হবে।
জুমচাষিরাও পড়েছেন ভয়াবহ বিপাকে। ১৬৯ নম্বর শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরা জানান, ২২টি পাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দা জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অবরোধে মাচলং বাজারে কৃষিপণ্য নিতে না পারায় কলা, পেঁপে, আখ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া ও কচু পচে নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি শুঁটকি, নাপ্পি ও জরুরি ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
পরিবহন খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানান, জেলায় প্রায় ২৫০টি তালিকাভুক্ত গাড়ি, ৫০০টির বেশি জিপ এবং দেড় হাজারের বেশি চাঁদের গাড়ি, মাহিন্দ্র ও সিএনজি চলাচল করে। অবরোধের কারণে এসব চালক, সহকারী ও মালিকদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে যানবাহন খাতে জেলায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। এ সময়ে প্রতিদিন গাড়ি চালানোর লাইন থাকত।
মাটিরাঙ্গার তবলছড়ির পিকআপ চালক ইসমাইল হোসেন জানান, পর্যটন মৌসুমে যেখানে প্রতিদিন আয় করে সংসার চলত, সেখানে সাত দিন ধরে গাড়ি বন্ধ থাকায় তিনি পাঁচ হাজার টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁর আট সদস্যের পরিবারে অসুস্থ বাবা-দাদি ও দুই ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে পিকআপের সহকারী মো. শাকিল খন্দকার ৬০০ টাকা দৈনিক মজুরি হারিয়ে ধারদেনা করে চলছেন। এ আয় দিয়ে ঘরভাড়াসহ চার সদস্যের সংসার চালাতে হয়। টাকার অভাবে প্রবারণা পূর্ণিমাও ভালোভাবে উদ্যাপন করতে পারেননি। সামনে কঠিন চীবর দান, কী করবেন বুঝতে পারছেন না।
চাঁদের গাড়ির চালক অংগোজাই মগ জানান, আয় বন্ধ হওয়ায় তিনি এখন দিনমজুরি করার কথা ভাবছেন। ঋণের বোঝা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন গাড়ির মালিক মো. মুন্না, যিনি আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গত বছর গাড়ি কিনেছিলেন এবং প্রতি মাসে তাকে ৩২ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। কিস্তি পরিশোধের অনিশ্চয়তায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনায় তাঁরাও কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছেন।
অবরোধের সময়সীমা ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে ১১ অক্টোবর প্রথম দিনের অবরোধ পালন করে। এরপর ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ডাক দিলেও দুর্গাপূজার কারণে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত ছিল। পরে বৃহস্পতিবার থেকে ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধ এখনো চলমান থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। উল্লেখ্য, সাজেক থেকে পর্যটকদের ফেরার পথে উজো বাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছে, তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।
সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে এবং অবরোধ চলাকালে হামলা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুরের প্রতিবাদে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ গত শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত থাকবে।