জাপানে চার দিনের সফল সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে ফ্লাইটটি টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত সোমবার তারেক রহমান জাপানে পৌঁছান। সফরকালে তিনি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন।
গত ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণাসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব। এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই পক্ষই একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি বড় সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করা হয়।
এর পাশাপাশি ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ২৯৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের দুটি ঋণ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের অনুদান চুক্তিও হয়েছে। এছাড়া কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক ও অভিপ্রায়পত্র স্বাক্ষর করা হয়। স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন বা ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলারের অনুদান চুক্তি। ঋণ প্রকল্প দুটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরেও জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) আয়োজিত ফোরামে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। টোকিওতে আয়োজিত অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে প্রধানমন্ত্রী মোটরগাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, দ্রুতগতির রেল, লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো পাঁচটি খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। গত ২৮ অক্টোবর টোকিওতে জেট্রোর সদর দপ্তরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
বিনিয়োগ ও শিল্প স্থাপনার সম্ভাবনা যাচাইয়ে প্রধানমন্ত্রী জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন ও জেইআরএ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া গত ২৭ অক্টোবর তিনি জাপানের ফুতসুতে জেইআরএর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইচিকাওয়ায় নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন। সফরের শেষ দিকে বৃহস্পতিবার তিনি নাগোয়া সফর করে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মোটোমাচি কারখানা ও টয়োটা কমেমোরেটিভ মিউজিয়াম অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি ঘুরে দেখেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এবারের উচ্চপর্যায়ের এই সফরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। চুক্তিটি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের নতুন কাঠামো তৈরি করেছে।