, ,

দেশে একের পর এক ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের বিভিন্ন জেলায় গত ১০ দিনে অন্তত সাতজনকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকার, কোনো কিছুই যেন অপরাধীদের থামাতে পারছে না। সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ মানুষ—এই তালিকায় বাদ যাচ্ছে না কেউই। ধারাবাহিকভাবে এমন সব ঘটনার কারণে জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ বিস্তার এবং অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে এখন সর্বত্রই প্রশ্ন উঠছে। দিনের আলো ফোটার আগেই এমন হত্যাকাণ্ড নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এরপর তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

সবশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে খুলনা মহানগরীর পূর্ব-বানিয়াখামার এলাকার আনসার আলী গলির সামনে তাওহিদুল ইসলাম (৩২) নামের এক যুবককে গুলি করে প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়। এর আগের দিন বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জহির ফকিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের ভাগিনা ইসমাইল হোসেনের ভাষ্যমতে, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সাথে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তার মামাকে হত্যা করা হয়েছে। ফার্মেসি থেকে বাসায় ফেরার পথে ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র তার ওপর হামলা চালায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে জহির ফকির নিজের ফার্মেসি বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে ১৫/২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ তার পথ আটকে দেন। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।

বুধবার ভোরের দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টার থেকে মাগুরা পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগের দিন ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া গ্রামের একটি দোকানের সামনে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি রূপসী বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে তিনি বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতেন। ঘটনার সময় তিনি তেলনজিয়া বাজারে শ্বশুরবাড়ির কাছে একটি দোকানে চা পান করে বের হচ্ছিলেন। এ সময় দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে।

১৬ অক্টোবর চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডে আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তারেক হোসেন বাপ্পি (২৬) নামের এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় তাফসির আলম শাওন (২২) গুরুতর আহত হন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, যুবদল নেতা সাদ্দামের কার্যালয়ের সামনে বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী এই হামলা চালায়। একই দিনে রাজবাড়ীতে এশার নামাজ পড়ে ফেরার পথে পিয়ারুল ইসলাম (৩০) নামের ১৫ মামলার আসামিকে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করে হেলমেট পরিহিত দুর্বৃত্তরা। এছাড়া ১২ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের বউবাজার এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে সাহেব আলী (৪৫) নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী নিহত হন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গুলি করে খালের পানিতে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়, যার বিরুদ্ধে হত্যা ও ডাকাতিসহ অন্তত ২০টি মামলা ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। ১৬ই অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ১৪ মামলার আসামি পিয়ারুল ইসলাম (৩০) নামে ব্যক্তি নিহত হন।

বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক এই হত্যাকাণ্ডগুলো পরিস্থিতির অবনতিরই ইঙ্গিত দেয়। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা মূল্যায়নে বস্তুগত নির্দেশকের চেয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিঘ্ন ঘটছে। সংঘাত বা টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনাকে রাজনৈতিক দোষারোপে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা জরুরি। অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার ধারণা পোষণ করে, তখনই অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পায় বলে তিনি মনে করেন।

তবে ভিন্ন মত জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশন্স) কামারুম মুনিরা বলেন, বিগত বছরের তুলনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে রয়েছে। ঘটে যাওয়া প্রতিটি হত্যাকাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোর অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধীদের হাতে অস্ত্র কীভাবে পৌঁছায়, তার উৎস বন্ধে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।