, ,

দিল্লিতে ঐতিহাসিক রেসকোর্স মসজিদ উচ্ছেদের শঙ্কায় মুসল্লিরা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন ‘৭, লোক কল্যাণ মার্গের’ কাছে অবস্থিত শতবর্ষী রেসকোর্স মসজিদ উচ্ছেদের আশঙ্কায় স্থানীয় মুসলিমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থাপনাটি ছাড়ার নোটিশ পাওয়ার পাশাপাশি মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে নিয়মিত ইবাদত পালন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ, নামাজে প্রবেশেও বিধিনিষেধ। বিকেলের দিকে অল্প কয়েকজনকে আসরের নামাজে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ওই এলাকার মুসল্লিদের যাতায়াত ও নিয়মিত নামাজ আদায় নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

মসজিদটি রেসকোর্স ক্লাবের ভেতরে অবস্থিত এবং ২০০৯ সালে নয়াদিল্লি পৌর পরিষদ (এনডিএমসি) এটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর (এলঅ্যান্ডডিও) জমিটিকে সরকারি সম্পত্তি দাবি করে স্থাপনাটিকে অননুমোদিত বলে অভিহিত করেছে। তাদের ভাষ্যমতে, মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ছয় দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সরকারি গেজেটে এই মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থানকে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর আহমদ ১৯ ও ২১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৃথক চিঠিতে বিদ্যুৎ ও পানির লাইন পুনরায় সচলের আবেদন জানালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত ৭ অক্টোবর থেকে মসজিদটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এনডিএমসি কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ওই এলাকায় চলামান বস্তি উচ্ছেদ ও নিরাপত্তার স্বার্থে সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব নয়। এলাকায় রেসকোর্স ক্লাব ও বস্তি মিলিয়ে প্রায় ৫৩ একর জমিতে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে, যার ফলে তিন বস্তির বাসিন্দাদের ৫০ কিলোমিটার দূরের সাভদা ঘেওরা এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশপাশে উচ্ছেদ অভিযান, বাস্তুচ্যুত শত শত পরিবার।

মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হারুন জানিয়েছেন, জমি ও স্থাপনা ত্যাগের জন্য তাকে মৌখিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। জুমার নামাজের সময় মুসল্লিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হলেও পরে পুলিশি বেষ্টনী তৈরি করা হয় এবং মাগরিবসহ বিভিন্ন ওয়াক্তে মুসল্লিদের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অজুর পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প এবং বিদ্যুতের জন্য জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মসজিদের ফটকে পুলিশ মোতায়েন ছিল। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের জন্য আসা কয়েকজনকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে মুসল্লিরা জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের দাবিতে ইমাম মোহাম্মদ হারুন দিল্লি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন। তবে ১৫ অক্টোবর আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেন। বিচারিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জমির মালিকানা ও উচ্ছেদ সংক্রান্ত বিতর্কের জটিল প্রশ্নগুলো রিট আবেদনের আওতায় নিষ্পত্তিযোগ্য নয়। এছাড়া আদালত উল্লেখ করেন যে, দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ড কর্তৃপক্ষ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়নি।

মসজিদ ও কবরস্থান রক্ষায় বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ মসজিদ রক্ষায় আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছে। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে দ্রুত এই সমস্যার সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছে। সূত্র: আলজাজিরা, দ্য ট্রিবিউন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, স্ক্রল, এনডিটিভি, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ওয়্যার ও দ্য হিন্দুস্তান গেজেট।

সরকারি কর্তৃপক্ষের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে জমিটি দখলমুক্ত করা হচ্ছে। তবে মুসলিমদের অভিযোগ, ঐতিহাসিক এই ধর্মীয় স্থাপনার বৈধতা থাকা সত্ত্বেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তা উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। মসজিদটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ভারতের মুসলিম সমাজ বর্তমানে বেশ ক্ষুব্ধ।

মসজিদের জমি নিয়ে সরকারি দপ্তর ও ওয়াক্‌ফ বোর্ডের পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং আইনি জটিলতার কারণে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। কার্যকর কোনো সমাধান না আসায় শতবর্ষী এই মসজিদটির অস্তিত্ব এখন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।