বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে এখন নতুন এক তরুণীকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এর সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা গেছে। পুলিশ এখন ওই রহস্যময় তরুণীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, যাতে ঘটনার আগের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব হয়। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। এদিকে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর।
এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার পর তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে হেফাজতে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। ওই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখিয়ে শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্তকারীদের মতে, ঘটনার রাতে তাহসিফ ও ওই তরুণী মোটরসাইকেলে রেস্টুরেন্ট ও বারে পৌঁছান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তারা সেখানে প্রবেশ করেন এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান। তরুণীর পরনে ছিল গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস, এবং তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ব্যাগ ছিল। তদন্তকারীরা এখন নিশ্চিত হতে চাইছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার সময় ওই তরুণী তাদের সঙ্গে ছিলেন কি না। এ সময় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পোশাকধারী দুই পুলিশ সদস্যকে দেখে তারা দৌড়ে দুই দিকে চলে যান। তার ভাষ্যমতে, এরপরই তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে পুলিশ এ বক্তব্যটি খতিয়ে দেখছে। নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দীপের দেওয়া তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে। তাই তিনি যে পুলিশের ধাওয়ার কথা বলছেন, তা সত্য কি না বা এর আড়ালে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে তার বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশের ধারণা, ওই এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের স্বার্থে তাহসিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর বিকালে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্যের ভিত্তিতে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারকালে তার পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরেই পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ।
এদিকে তাহসিফের অকাল মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’। সংগঠনের নেতারা তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম জানান, তারা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। সাবেক কর্মকর্তা মেজর আল আমিনও এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীপ ঘটনার পুরো সময় তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন, তাই তার কাছ থেকেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসতে পারে।
বর্তমানে রিমান্ডে থাকা দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো এবং কেন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন, সেই বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাশাপাশি মোটরসাইকেলটি কীভাবে ঘটনাস্থলে গেল, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।