চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পুলক নাথ (২৫) সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে আবুধাবির মোছাফফা শহরে নিজের কর্মস্থলে সহকর্মীর হামলায় তাঁর মৃত্যু হয়। পাঁচ বছরের প্রবাস জীবন শেষে আগামী শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেশে ফেরার কথা ছিল পুলকের। সেই লক্ষ্যে দিনক্ষণও চূড়ান্ত ছিল, কিন্তু অকাল মৃত্যুতে তাঁর বাড়ি ফেরা আর হলো না। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর আনন্দে রূপ নিল না। কখনো চোখের পানি মুছছিলেন, কখনো নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকছিলেন শূন্যের দিকে। এদিকে পুলকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন।
পরিবারের অভিযোগ, মাত্র ২০ দিরহাম নিয়ে বিরোধের জেরে মিশরীয় এক রুমমেট পুলককে ছুরিকাঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পুলকের ছোট ভাই অলক নাথ জানিয়েছেন, তাঁর ভাইয়ের কাছে পাওনা ২০ দিরহাম চাওয়া নিয়ে ওই রুমমেট তর্কে জড়ান এবং এক পর্যায়ে তাঁকে ছুরিকাঘাত করেন। ঘটনার খবর পাওয়ার পর চট্টগ্রামভিত্তিক সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। ওই টাকা না দেওয়ায় তাঁর বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয় বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পুলক সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
দেশে থাকা মা, প্রতিবন্ধী ছোট ভাই ও অন্যান্য স্বজনদের সব দায়িত্ব তাঁর পাঠানো আয়ের ওপরই নির্ভর করত। বড় ছেলেকে হারিয়ে মা রানী বালা দেবী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। শোকের মাতম চলছে পটিয়ার বিবেকানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকার নিজ বাড়িতে। স্থানীয়দের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনরাও তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর পাঠানো অর্থেই চলত মা, প্রতিবন্ধী ছোট ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনযাপন। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে পুলকের মা রানী বালা দেবী বলেন, আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল ছেলেটি। কত আশা নিয়ে পাঁচ বছর পর তাঁর ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু এখন আর সেই ছেলে ফিরবে না। তিনি তাঁর ছেলের হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং সরকারি উদ্যোগে দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন। একই দাবি জানিয়েছেন পুলকের বোন চুমকি দেবী। তিনি বলেন, ভাইয়ের ফেরার প্রতীক্ষায় আমাদের পুরো পরিবারের সব স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ছেলের মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা রানী বালা দেবী। যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, কয়েক দিন পর যে ছেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা, সেই ছেলে আর কোনো দিন ফিরবে না। ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর রাঙ্গুনিয়ায় বসবাসকারী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর পাই। পাঁচ বছর ধরে প্রবাসে থেকে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছিলেন পুলক।
এ বিষয়ে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, দূতাবাসের মাধ্যমে পুলক নাথের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পুলিশি সহায়তার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই দেওয়া হবে। শোকসন্তপ্ত পরিবার এখন প্রবাসীর নিথর দেহ শেষবারের মতো নিজের কোলে পাওয়ার আকুল অপেক্ষায় দিন গুনছে।