আজ বুধবার, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

সোনারগাঁয়ে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি, পর্যটকদের পদচারণায় মুখোরিত

সোনারগাঁ প্রতিনিধি: সোনারগাঁয়ের সাচিলাপুর গ্রামে বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি পরিদর্শনে প্রতিদিন ভিড় জমান দেশবিদেশের পর্যটকরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা হয়ে সাচিলাপুর গ্রামে আগের মতো তেমন জৌলুস না থাকলেও দেশবিদেশের পর্যটকদের কাছে এখনো আকর্ষনের কমতি নেই এ গ্রামের একটি সমাধিকে কেন্দ্র করে। দেশবিদেশের পর্যটকরা সোনারগাঁয়ে বেঁড়াতে আসলে অনেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি পরিদর্শন করতে আসেন। ফলে বছরজুড়েই এ গ্রামে পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত থাকে।

জানা যায়, বাংলার শাসনকর্তা সুলতান সিকান্দর শাহের বিদ্রোহী পুত্র গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি ১৩৮৯ সালে সিংহাসন দখল করেন। ১৩৮৯-১৪১০ সাল পর্যন্ত প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান ছিলেন গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ। তিনি বাংলার সুপরিচিত সুলতানদের অন্যতম ছিলেন। তার প্রকৃত নাম আযম শাহ। সিংহাসনে আরোহনের পর তিনি গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ নামে পরিচিত হন। রাজত্বকালে তিনি ছিলেন খ্যাতির শীর্ষে। তার আমলে শিক্ষাদিক্ষা, সাহিত্য, চারু ও কারু কলার উন্নতি হয়। তিনি ন্যায় বিচারক শাসক ছিলেন। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্ব। কবি হাফিজকে বাংলায় নিমন্ত্রন করার জবাবে কবি হাফিজ গিয়াস উদ্দিন আযম শাহকে একটি গজল রচনা করে পাঠিয়েছিলেন। ২২ বছর রাজত্ব করার পর ঘাতকরা তার প্রাণ কেড়ে নেন। ১৪১১ সালে নিহত হওয়ার পর তাকে সাচিলাপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। অধ্যাপক দানী, এই গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর সমাধিকে বাংলাদেশের প্রাচীনতম মুসলিম কীর্তি বলে উল্লেখ করেছেন।
সরেজমিন, সাচিলাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের মাজারের পাশে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি বিলবোর্ড। এতে লেখা রয়েছে ‘কোন ব্যক্তি এ পুরাকীর্তির কোন রকম ধ্বংস, বিকৃতি, পরিবর্তন কিংবা ক্ষয়ক্ষতি করলে পুরাকীর্তি আইন ১৯৭৬ এর ১৯ ধারা অনুযায়ী ১ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, ১৯২০ সালের ২২ নভেম্বর সরকার গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধিকে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায় নথিভূক্ত করে। সর্বশেষ ১৯৮৫ সালে সরকার এ সমাধির সংস্কার কাজ করেন। পুরো সমাধিটি কষ্টি পাথরে গড়া। ১০ ফুট লম্বা, ৫ ফুট চওড়া ও ৩ ফুট উঁচু এ সমাধির ৩ ফুট উচ্চতার খিলানের উপর আরো দেড় ফুট উচ্চতায় ৭ ফুট লম্বা অর্ধবৃত্তকার কষ্টি পাথরে ডাকা। ৭ ফুট লম্বা পাথরটির তলদেশ প্রায় ২০ ইঞ্চি চওড়া। মূল সমাধির কার্নিশে রযেছে সুক্ষ্ম কারুকাজ খচিত অলঙ্কার। দুপাশে রয়েছে তিনটি করে তিন খাজ বিশিষ্ট খিলান। খাজের মধ্যে রয়েছে প্রলম্বিত শিকল ও ঝুলন্ত ঘন্টার নকশা।

মাজারটি কালো পাথরে তৈয়ারী বলে স্থানীয়রা একে কালো দরগা নামে চিনে। পাথরের গায়ে এমন কারুকাজ করা মাজার বাংলাদেশে বিরল। সমাধির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একটি খাল। ধারনা করা হয় তিনি এ খালটি খনন করেছিলেন, শত্রুদের আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে।

সাচিলাপুর গ্রামের বাসিন্দা আক্কাস মিয়া (৬৫) জানান, বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধি আমাদের গ্রামে থাকায় আমরা গর্বিত। এ সমাধিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের পদচারনায় সারা বছরই আমাদের গ্রাম মুখরিত থাকে। এ সমাধিকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যবসা-বানিজ্য ও সাহিত্য চর্চা বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পাড়ছে।

কুমিল্লা থেকে সমাধি পরিদর্শনে আসা শিক্ষক মহি উদ্দিন জানান, তার স্ত্রী ও স্কুলে পড়–য়া দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন। ছেলে মেয়েদের বাংলার ইতিহাস ও শাসকদের সঙ্গে পরিচয় করাতে এখানে আসা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীনুর ইসলাম জানান, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের সমাধিকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের ভিড় বছরজুড়েই থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা এ সমাধির উন্নয়ন ও এর রক্ষনাবেক্ষন করে আসছি।