সেন্ট মার্টিন দ্বীপে প্রতিদিন পর্যটক যাতায়াতের সংখ্যা দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে রাতযাপনের সুযোগও দুই মাস থেকে বাড়িয়ে সাড়ে চার মাস করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন এবং প্রত্যেককে একশ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পর্যটক বাড়লে সুপেয় পানির চাহিদার পাশাপাশি বাড়বে পয়োবর্জ্য, আবর্জনা ও সৈকতে মানুষের আনাগোনা। এতে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর থেকেই রাতে থাকা যাবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, প্রতিদিন অন্তত ছয় হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন জাহাজমালিক ও হোটেল-রিসোর্টের মালিকেরা। মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা খানম দেশের বাইরে আছেন। দীর্ঘদিনের দূষণ ও মানুষের অবাধ বিচরণের চাপ থেকে প্রাণপ্রকৃতির কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ এবং দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরবর্তী সময়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই সময় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ পেতেন। তবে পর্যটন ব্যবসায়ীদের চাপে সরকার এবারের পর্যটন মৌসুমে এই সীমা বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের অনুমতি দিয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। গত দুই মৌসুমে ২ লাখ ৩৭ হাজার পর্যটক দ্বীপটি ভ্রমণ করেছেন, যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকের কম। এখন পর্যটকের দৈনিক সীমা একলাফে ৭৫ শতাংশ বাড়ানোয় সেই সুফল ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আগের দুই হাজার পর্যটকের সীমা নিয়ন্ত্রণ করতেই প্রশাসনকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। তাই সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের ওপর কার্যকর নজরদারি কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়া পর্যটকদের কাছ থেকে নেওয়া ১০০ টাকা পরিবেশের কোন খাতে ব্যয় করা হবে, তা নিয়েও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তা ছাড়া পর্যটকদের কাছ থেকে আদায় করা ১০০ টাকা কোথায় ব্যয় করা হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দ্বীপের অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত না করে এভাবে পর্যটক সংখ্যা বাড়ানো হলে প্রাণপ্রকৃতি নতুন ঝুঁকিতে পড়বে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, দ্বীপের পরিবেশগত বহনক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ পর্যটক যাওয়া যুক্তিসংগত। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই এই সীমা বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে গণপর্যটনের সুযোগ থাকলেও সেন্ট মার্টিনে একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্জ্য শোধন ও অপসারণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে এসবের দূষণ সৈকত ও সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে।
সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গত কয়েক দশকে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একসময় দ্বীপটিতে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য ছিল, যা এখন প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যটন বন্ধ থাকার সময় সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। কেয়াবন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। বছরের বাকি সময় দ্বীপটি প্রায় পর্যটকশূন্য থাকত। অনেক স্থাপনার পরিবেশ ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদনও ছিল না। ২০২৬ সালের মে মাসে জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকার সময়ে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ উল্ল। প্রবাল, সামুদ্রিক কাছিম, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস ছিল এটি।
সাবেক সরকারের নেওয়া আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পর্যটননির্ভর পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ ছিল। একটি মহাপরিকল্পনাও খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়েছিল, যেখানে প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্তমান সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি এবং মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়েছেন বা পাওয়া যায়নি। তাঁর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেনের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও জবাব পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বীপজুড়ে একের পর এক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে ওঠে।
সেন্ট মার্টিনের সৈকতে রাতযাপনের ক্ষেত্রে উচ্চ শব্দ, বারবিকিউ এবং অতিরিক্ত আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ থাকার কথা থাকলেও এগুলো কতটা কঠোরভাবে কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। দ্বীপের বর্জ্য অপসারণ ও পানি সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করায় বাড়তি পর্যটকের চাপ সরাসরি স্থানীয় প্রতিবেশের ওপর পড়বে। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও পয়োবর্জ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বীপটির পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে পর্যটকের ভিড়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে প্লাস্টিকসহ অন্যান্য বর্জ্য। পর্যটকের চাপ কমলে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের উন্নতি হয়, এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়।