মাঠের ভেতর গোল আর বাইরে ব্যবসার মুনাফা—দুটি ক্ষেত্রেই সমান্তরালভাবে সাফল্য পেয়েছেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইন। গোল করেন, গোল্ডেন বুট জেতেন, কিন্তু ট্রফি জেতেন না। টটেনহামে থাকতে এই অপবাদ কিছুতেই ঘোচাতে পারেননি। সেই কেইন আবার সমান সফল ব্যবসার মাঠেও। এমন পরিকল্পনা অবশ্য রাতারাতি করেননি কেইন।
মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে বায়ার্ন মিউনিখ এবং জাতীয় দলের হয়ে চলতি বছর ৭৩টি গোল করেছেন এই স্ট্রাইকার। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে সব প্রতিযোগিতায় করেছেন ৭৩ গোল।
তার এই দুর্দান্ত সাফল্যের মুকুটে সর্বশেষ সংযোজন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর। মেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে।
দীর্ঘ ২৫ বছর পর প্রথম কোনো ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতেছেন তিনি। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের মতো তরুণ তারকাদের পেছনে ফেলে ৩৩ বছর বয়সে সেরার মুকুটটি নিজের করে নিয়েছেন কেইন। একই সঙ্গে জিতেছেন বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের খেতাবও। বায়ার্ন মিউনিখকে টানা দ্বিতীয় বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতানোর পাশাপাশি ঘরোয়া ট্রেবল জয়ের পেছনেও মূল ভূমিকা ছিল তার। একসময় তাঁকে নিয়ে একটা রসিকতা চালু ছিল। টটেনহামের মূল দলে জায়গা করে নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা।
ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই কেইন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ২০১৪ সালের অক্টোবরেই তিনি পরিবার নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘এইচকে২৮ লিমিটেড’। ‘দ্য হ্যারি কেইন কোম্পানি’ নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তার ফুটবল, ব্যবসা, বিনোদন ও দাতব্য কার্যক্রমের সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্য অনেক তারকার মতো তিনি কোনো বাইরের এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে নিজেই নিজের আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলো পরিচালনা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হলো কেইনের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের উৎসাহিত করা, শিক্ষা প্রদান এবং ক্ষমতায়ন করা। মাঠে গোল করার জন্য হ্যারি কেইনের দুটো পা আছে। তবে শুধু পরিবারের মধ্যেই ব্যবসা সীমাবদ্ধ রাখেননি কেইন। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো ফুটবল একাডেমি। তবে এসব চুক্তির কোনোটিই তাঁর ফুটবল বুটের চুক্তির কাছে দাঁড়াতে পারে না।
আবাসন খাতেও তার ব্যবসার বড় একটি অংশ রয়েছে। ‘এডওয়ার্ড জেমস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাবা, মা এবং ভাই চার্লির সহায়তায় এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। কেইনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ভাই চার্লি তার উপার্জিত অর্থ সঠিক জায়গায় বিনিয়োগের বিষয়টি তদারকি করেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের আবাসন সম্পত্তির বাজারমূল্য দেড় কোটি পাউন্ড ছাড়িয়েছে। ভাইয়ের উপার্জিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করলে আরও বাড়বে, সেটাও দেখেন চার্লি। ইয়ামাল কি সত্যিই পুরস্কারটি জিততে চেয়েছেন।
পরিবারের বাইরেও কেইনের বিনিয়োগ বিস্তৃত। চেলসির সাবেক কিংবদন্তি জন টেরির সাথে যৌথভাবে তিনি ‘সিট ইউনিক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। বিভিন্ন ইভেন্ট ও অনুষ্ঠানের টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রির কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য বর্তমানে ৫০ কোটি পাউন্ডের চেয়েও বেশি। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অ্যামাজন, ক্যাডবেরি এবং টপসের সাথে তার ব্যবসায়িক চুক্তি রয়েছে। বাভারিয়ার স্থানীয় বাজার দখলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন জার্মান ওটস ব্র্যান্ড থ্রিবিয়ার্সের সাথেও। হাত মিলিয়েছেন একসময়ের মাঠের প্রতিপক্ষ চেলসির কিংবদন্তি জন টেরির সঙ্গেও।
মাঠের বাইরের আয়ের তুলনায় স্কেচার্সের সাথে করা চুক্তিটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় ব্র্যান্ড ছেড়ে স্কেচার্সের সাথে আজীবনের চুক্তি করে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দিয়েছিলেন কেইন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেবল এই চুক্তি থেকেই তিনি বছরে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয় করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় বায়ার্ন মিউনিখ থেকে পাওয়া বিশাল অঙ্কের বেতন। সপ্তাহে ৪ লাখ পাউন্ড হিসেবে বছরে তার বেতন প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ পাউন্ড। বর্তমান সময়ে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতনভুক্ত খেলোয়াড়দের একজন তিনি। শেষ পর্যন্ত উত্তর লন্ডনের মায়া ছেড়ে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। তারপর যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গেলেন। বায়ার্নে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরেই সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন কেইন।
বয়স ৩৩ হলেও কেইনের ফর্ম ও গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে ঘিরেই নতুন পরিকল্পনার ছক আঁকছে বায়ার্ন মিউনিখ। ডেইলি মেইল স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ার্নের সাথে নতুন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তিনি। নতুন চুক্তি সম্পন্ন হলে তার আয় আরও বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে নেওয়া দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই আজ মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি আর্থিক সমৃদ্ধিতেও তিনি অনন্য উচ্চতায়। একদিকে গোলের উৎসব, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য—এই দুই ভুবন এখন হ্যারি কেইনের দখলে। বয়স ৩৩ হলেও জার্মান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে চায় ইংল্যান্ড অধিনায়ককে।