, ,

নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আরব জোটের ঐতিহাসিক সুযোগ

ইসরাইলের সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক আসন অর্জনের পর ফিলিস্তিনি-আরব দলগুলোর জোট দেশটির সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে। জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন ঘোষণা দিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের ক্ষমতা থেকে সরাতে তারা বিরোধী ‘চেঞ্জ’ জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। জাবারিনের মতে, এটি ইসরাইলের সামগ্রিক রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। জাবারিনের ভাষ্য, প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার ফিলিস্তিনি-ইসরাইলি ভোটারের প্রধান দাবি হলো নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো। উত্তর ইসরাইলের উম্ম আল-ফাহম শহরে নিজের পারিবারিক বাসভবনে জাবারিন বলেন, আইজেনকোটের দেওয়া শর্তগুলো মূলত সরকারে সরাসরি অংশ নেওয়া দলগুলোর জন্য প্রযোজ্য। ডানপন্থী বিরোধী নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানাচ্ছেন বলে জানা গেছে। জয়েন্ট লিস্টের কর্মকর্তারা বলছেন, ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের বিষয়টি লিবারম্যানের জন্য সত্যিই আপত্তিকর, নাকি তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য দর-কষাকষি করছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

নির্বাচনে আরব ইসরাইলিদের ভোটদানের হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছানোয় দেশটির নির্বাচনী দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। পার্লামেন্ট নেসেটে আরব দলগুলোর রেকর্ড ১৯টি আসন লাভ সরকার গঠন ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নির্ণায়ক করে তুলেছে। তবে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাদের বিপুল অংশগ্রহণ দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে তাদের। সব মিলিয়ে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা ১৯, যা দেশটির পার্লামেন্টে তাদের জন্য রেকর্ড।

গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাবারিন জানান, আরব ভোটারদের প্রধান লক্ষ্যই হলো নেতানিয়াহু সরকারের বিদায় নিশ্চিত করা। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের মতো কট্টরপন্থি নেতাদের সরকারের বাইরে দেখতে চায় আরব সম্প্রদায়। জাবারিন বলেন, গত চার বছর আরবদের জন্য ভয়াবহ ছিল। কাঠামোগত বৈষম্য, বাড়িঘর ভাঙা, পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, বরাদ্দহীনতা এবং তরুণদের সুযোগের অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর পাশাপাশি বর্ণবাদ ও পুলিশের নিষ্ঠুরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ৫৪ বছর বয়সী জাবারিন পেশায় আইন বিষয়ে সাবেক অধ্যাপক। অন্য নাগরিকদের মতো সমান মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে তাদের।

ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ জটিল পর্যায়ে রয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর জোটের আসন সংখ্যা ৬৮ থেকে কমে ৫৩-তে নেমেছে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘চেঞ্জ’ জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কারো নেই। জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন এবং রক্ষণশীল ইসলামপন্থি দল রা’আম পেয়েছে আটটি আসন।

আইজেনকোট ও তার সহযোগীরা নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আরব দলগুলোর সামনে শর্তের পাহাড় রেখেছেন।

এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ মেনে নেওয়া এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিন্দা করা।

মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রা’আম সরকারে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখালেও, জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান ভিন্ন।

জাবারিন পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব বহাল থাকা অবস্থায় কোনো সরকারের সরাসরি অংশ হওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব।

তবে সরকারে যোগ না দিয়েও পার্লামেন্টে কৌশলগত ভোটের মাধ্যমে তারা বিরোধী জোটকে টিকিয়ে রাখার সহায়তা করতে পারেন।

জাবারিনের ভাষ্যমতে, বর্তমান নেসেটে নেতানিয়াহু-বিরোধী সদস্য রয়েছেন ৬৭ জন। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তারা নেসেটের স্পিকার পরিবর্তন এবং আইন প্রণয়ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারেন। নতুন সরকার গঠনের আগেই বিরোধীরা এভাবে আইনি ক্ষমতা নিজেদের দখলে নিতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। আশা করি, বিরোধী শিবিরে এমন অংশীদার পাওয়া যাবে, যারা এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে এগিয়ে আসবে।’। নতুন পার্লামেন্টের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বিদায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের পাস করা এমন আইন বাতিল করা, যেগুলো ইসরায়েলের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে করেন তিনি। নেতানিয়াহুকে সরিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন এবং সেটিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হলে ইসরায়েলি সমাজের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন জাবারিন।

নেতানিয়াহুর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাবারিন জানান, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারেন। নির্বাচনের আগে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে কাতারের অর্থ অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন নেতানিয়াহু। জাবারিন একে বিপজ্জনক উসকানি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, আরবদের রাজনৈতিক শক্তিকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতেই এই চক্রান্ত করা হয়েছে। এছাড়া, ক্ষমতার পালাবদল ঠেকাতে নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিশেষে, জাবারিন জোর দিয়ে বলেন যে আইজেনকোট যদি পরিবর্তনের কথা বলেন, তবে সেই পরিবর্তনের সুফল আরব সম্প্রদায়ের কাছেও পৌঁছাতে হবে। তিনি ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং নীতিতে পরিবর্তন আনার এবং আরব ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সময়।