, ,

দারিদ্র্যকে জয় করে ফুটবল মাঠ মাতাচ্ছেন পটিয়ার অন্তু দে

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামের মেয়ে অন্তু দে। বয়স আঠারো পেরোতেই তিনি পরিচিতি পেয়েছেন দক্ষ ফুটবলার হিসেবে। শৈশবে বাড়ির আঙিনায় ফুটবল নিয়ে খেলা শুরু করলেও, অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে আজ তিনি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিয়মিত ডাক পাচ্ছেন। অন্তুর এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বাবা রতন দে একসময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, বর্তমানে একটি ছোট পানের দোকান চালিয়ে সংসার চালান। অভাব-অনটনে জর্জরিত তাদের টিনের ছাপড়া ঘরটি জরাজীর্ণ, বৃষ্টি এলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। তবুও মেয়ের ফুটবলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আগ্রহ দেখে অন্তুর মা লক্ষ্মী দে কখনো তাকে বাধা দেননি, বরং সাহস জুগিয়েছেন। গ্রামের মেঠো পথ পেরিয়ে গাছপালার ভেতরে অন্তু দের বাড়ি। এর সবগুলোই ফুটবল খেলে অর্জন করেছেন বলে জানালেন অন্তু। ওই ম্যাচে পটিয়া জিতলেও পরবর্তী সময়ে আনোয়ারা উপজেলার দলের কাছে হেরে যায় অন্তুদের দল। প্রথম ম্যাচে ফেনীর কাছে চট্টগ্রাম ২-০ গোলে হেরে যায়। পরে ফেনীতে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের খেলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দল রানারআপ হয়। ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেক কটূক্তির স্বীকার হয়েছেন বলেও জানান অন্তু। অন্তু দের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়েরা এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।’।

ফুটবলের হাতেখড়ি ও প্রাথমিক ধাপ

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই অন্তুর ফুটবলের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয়। তখন বাড়ির উঠানে প্রতিবেশী ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতেন তিনি। এক চাচাতো ভাই তাকে মাঠে নিয়ে যেতেন, যা তার খেলার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বিদ্যালয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পান এবং তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সাগর দে তার প্রতিভা দেখে বিশেষ উৎসাহ দেন। চক্রশালা কৃষি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তির পর সপ্তম শ্রেণিতে অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় তার খেলার পথ প্রশস্ত হয়। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক সমর কান্তি দে ও জসিম উদ্দিনের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় সংগঠক সৈয়দ সাইফুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসেন। ছালেহ নূর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন অন্তু দে। শৈশবে আমার চাচাতো ভাই প্রকাশ দে আমাকে খেলাধুলায় বেশ উৎসাহ দিয়েছেন।’। নাছরিন আক্তার জানান, ২০১৭ সালে এলাকার নারী খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ শুরু করেন সৈয়দ সাইফুল ইসলাম। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে তাঁদের উৎসাহ দিতে না পারলে তাঁদের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।

একাডেমিক প্রশিক্ষণ ও সাফল্যের যাত্রা

  • পটিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে একাডেমির প্রায় ৪০ জন খেলোয়াড়ের সাথে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন অন্তু।
  • অনুশীলনের মাত্র দুই দিনের মাথায় ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে লোহাগাড়া উপজেলার বিপক্ষে মাঠে নামেন তিনি।
  • ২০১৮ সালের শেষে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে উপজেলা পর্যায়ে পটিয়া চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল অন্তুর।
  • জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে ৪০ জন খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে ১৮ জনের দলে স্থান পান এবং চূড়ান্ত ১১ জনের মূল একাদশে নিজের জায়গা পোক্ত করেন।

জাতীয় পর্যায়ে পদচারণা

২০২০ সালে ঢাকায় বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার পর থেকে অন্তুর ক্যারিয়ারে নতুন মোড় আসে। তিনি রংপুর, কক্সবাজার, নীলফামারী, বগুড়া, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা ও জয়পুরহাটসহ দেশের নানা প্রান্তে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। ২০২১ সালের যুব গেমসে চট্টগ্রাম জেলা দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে অন্তু ছিলেন অন্যতম কারিগর। ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ উইমেনস লিগে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে তার পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে। এছাড়া ফুটসাল লিগে চাঁদপুর ফুটবল ক্লাবের হয়েও খেলেছেন তিনি। খেলা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও আর্থিক সহযোগিতা করছেন। এ পর্যন্ত তিনি চারটি সেরা খেলোয়াড় ও পাঁচটি ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জিতেছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, টিন ও মাটির তৈরি ছোট ঘরটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। ছেলে সৈকত দে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে একটি মুরগির খামার করছেন। একই বছর আনোয়ারার একটি দলের হয়ে সিলেটে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

সংগঠক ও কোচের ভূমিকা

পটিয়া মহিলা ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ডা. সৈয়দ সাইফুল ইসলাম অন্তুর ক্যারিয়ারের মূল কারিগর।

প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ করে দিতেই তিনি এই একাডেমি গড়ে তুলেছেন।

অন্তুর পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা বুঝে তিনি নিয়মিত ব্যক্তিগত সহযোগিতা করেছেন।

এছাড়া অন্তু নিজেও এখন তার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁদের সহায়তা না পেলে এত দূর আশা কঠিন হতো।

প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন জানান, অন্তু শুধু নিজেই দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠেনি, বরং অন্য ছাত্রীদেরও ফুটবলের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। জানতে চাইলে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নাছির উদ্দিন বলেন, ‘সে তো আমাদের বিদ্যালয়েরই ছাত্রী।

অন্তুর স্বপ্ন, একদিন জাতীয় নারী ফুটবল দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা।

পটিয়াতে মেয়েদের অনুশীলনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাঠ না থাকা সত্ত্বেও, শত বাধা ও সামাজিক কটূক্তি পেছনে ফেলে তিনি এগিয়ে চলেছেন লক্ষ্যের দিকে। মেয়েদের অনুশীলনের জন্য আলাদা মাঠের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁরা আরও এগিয়ে যেতেন।