, ,

চ্যালেঞ্জ অনেক থাকলেও সরকার হার মানবে না: জাহেদ উর রহমান

শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও বিদায় একটি যুদ্ধের বিজয় হলেও সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল সংগ্রামটি কেবল শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা যেকোনো দলের পক্ষেই একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠন করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতো। প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রকে একটি গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অকার্যকর অবস্থার উন্নতি ঘটানো বর্তমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও পলায়ন একটা যুদ্ধের বিজয়, কিন্তু বৃহত্তর যুদ্ধটা এতে শেষ হয়ে যায়নি। আওয়ামী লীগের মাফিয়া দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে অকার্যকর করা হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল। এগুলোও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সহনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে দক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দেশে নানা সমস্যা থাকবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে মানুষ সেই সমস্যাগুলোর চাপ আরও বেশি অনুভব করে।

অনেকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে শ্রীলঙ্কা বা নেপালের পরিবর্তনের তুলনা টানলেও সেটিকে যথাযথ মনে করেন না জাহেদ উর রহমান।

তার মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর তিউনিসিয়া বা আরব বসন্তের দেশগুলোর অভিজ্ঞতাই বরং বেশি প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বুঝতে হলে বরং তিউনিসিয়া কিংবা আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, ওই দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও দীর্ঘ সময় ধরে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব–পরিস্থিতি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও নির্বাহী বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত একটি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকার কারণে বর্তমান সরকারকে একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। পরিবারপ্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল অবাধ ভোটাধিকার এবং স্থানীয় সরকারসহ সব পর্যায়ে পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বাধীনতা। বর্তমান সরকারের আট মাসের কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ না হলেও সরকার প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে কাজ গুছিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অংশগ্রহণমূলক কাজে অভ্যস্ত না হওয়ায় সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকারেও সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। সরকারের আট মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গেলে এই প্রত্যাশাগুলোর কথা বিবেচনায় নিতে হবে। অস্বীকার করা যাবে না যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনগণ যতটা অগ্রগতি আশা করেছিল, বাস্তবে তার চেয়ে কম হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেখতে হবে, সরকার কোন পরিস্থিতিতে কাজ শুরু করেছে। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনকে কীভাবে কাজ করতে হবে, সেটিও নতুন করে আয়ত্ত করতে হচ্ছে। মানুষের আয়রোজগার ও জীবনযাত্রায় সংকট তৈরি হলে অন্য সমস্যাগুলো অনেক বড় হয়ে ওঠে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশকে তার বড় মূল্য দিতে হচ্ছে।

তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার সহনশীলতার পরিচয় দিচ্ছে। বিরোধী পক্ষ ও নাগরিক সমাজ সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও সরকার তা ইতিবাচকভাবে দেখছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অপরিহার্য। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যেখানে হাসিনা আমলের দুর্নীতি ও লুটপাটের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি ভিজিএফ ও খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে ৪১ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য ধরলে প্রায় দুই কোটি মানুষ এই সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র দ্রুত কাজে লাগানো, নতুন খনন কার্যক্রম এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার উৎসাহিত করার মাধ্যমে জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। মানুষ আরও চায়, নির্বাচিত সরকার তাদের ভালো-মন্দের তদারক করুক। বাংলাদেশ এই সংকটের মুখে পড়েছে এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উন্নয়নে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জাহেদ উর রহমান জানান, ৫ আগস্টের আগের পুলিশ বাহিনী এবং বর্তমান বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীকে অনেকটা সামরিকীকরণ করা হয়েছিল, যা কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাম্য নয়। ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সহজ ছিল না, তবে বর্তমান পুলিশ বাহিনী আগের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ করছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশ যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে আসাও সহজ ছিল না।

রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারির যে অভিযোগগুলো উঠছে, তা মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে আছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, স্বৈরাচারী পতনের পর রাতারাতি সব অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়, তবে অপরাধের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে দখলদারি ও আইন ভঙ্গের দায়ে একজন সংসদ সদস্য ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়েছে, যা নাগরিকদের এই বার্তা দিয়েছে যে, সরকার অভিযোগগুলো উপেক্ষা করছে না।

তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ আরও বাড়বে। এছাড়া বিভিন্ন আইন নিয়ে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগের বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সাথে দেখছে। কোনো আইনের অপপ্রয়োগ যেন না হয় এবং প্রয়োজনে যেন আইন সংশোধন করা যায়, সে বিষয়ে সরকার উন্মুক্ত। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বড় গুণ হলো নিজের ভুল স্বীকার করা এবং তা সংশোধন করার সক্ষমতা রাখা, যা এই সরকার বজায় রেখেছে বলে তিনি মনে করেন। কোনো কোনো বক্তব্য কারও কাছে গ্রহণযোগ্যতার সীমা অতিক্রম করেছে বলেও মনে হতে পারে।