, ,

উখিয়ায় সড়ক দখল করে অবৈধ বাজার ও পার্কিংয়ের দৌরাত্ম্য

দক্ষিণ কক্সবাজারের ব্যস্ততম উখিয়ার আরাকান সড়ক এখন অবৈধ পার্কিং ও সারি সারি ঝুপড়ি দোকানের দখলে। বিশেষ করে কুতুপালং এলাকায় সড়কের দুই পাশ অবৈধ বাজার ও স্থাপনায় জবরদখল হয়ে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। যে পথ পাড়ি দিতে মাত্র এক মিনিট সময়ের প্রয়োজন হওয়ার কথা, সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত বিভিন্ন যানবাহনের চালক, ভিআইপি বহনকারী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখের সামনে এই দখলযজ্ঞ চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনদুর্ভোগ কেবল বাড়ছেই। উপজেলার কুতুপালং এলাকায় সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার, স্থাপনা ও পার্কিং। ফলে এক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে ঘণ্টারও বেশি সময়। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এসব অবৈধ দখলের ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। কুতুপালং এলাকার আমিন নামের এক পথচারী বলেন, বাজারে একটু যাওয়া মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা। এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ থাকা আর না-থাকা সমান। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এক পাশে সিএনজি, অন্য পাশে ঝুপড়ি দোকান—সব মিলিয়ে সড়কের অবস্থা একেবারে নাজুক। সড়কের ওপর অবৈধভাবে জাম্বুরা বিক্রি করা সৈয়দুর রহমান বলেন, বাজারে জায়গা দিতে না পেরে আমাকে এখানে বসানো হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একটি সিন্ডিকেট এই সড়ক দখলকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা এবং প্রতিটি গাড়ি পার্কিংয়ের বিপরীতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রতি দোকান থেকে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে এক ভাই সংগ্রহ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, এই অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একাংশকে ম্যানেজ করে দখল ও বাজারের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

কুতুপালং বাজারের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে সরকারের নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বাজার ইজারা নেয়ার পেছনে হেলাল উদ্দিন মেম্বারের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ ২ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বোরহান উদ্দিন বাজারটি ইজারা নিয়েছেন। সকালে রাস্তায় গাড়ি একেবারেই এগোতে চায় না।

কুতুপালং ছাড়াও কোটবাজার, মরিচ্যা বাজার, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালীর চিত্র অনেকটা একই রকম। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত পার্কিংয়ের কারণে সড়কগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। পার্কিংয়ের লাইনম্যানদের ভাষ্যমতে, উপরের নির্দেশে তারা নির্দিষ্ট অংকের টাকা আদায় করেন; এই টাকা ছাড়া এখানে গাড়ি রাখা সম্ভব নয়। স্থানীয় বাসিন্দা আমিন ও চাকরিজীবী জাবেদ জানান, প্রতিদিন যানজটে আটকা পড়ে জরুরি রোগী নিয়ে চলাচলসহ দাপ্তরিক কাজে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। শিক্ষার্থীদেরও স্কুলে যেতে বাড়তি সময় নিয়ে বের হতে হচ্ছে, কারণ ট্রাফিক ব্যবস্থার কোনো প্রতিফলন সড়কে নেই। জরুরি রোগী নিয়েও অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। কুতুপালং উচ্চবিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে তাদের দেরি হয়ে যায়।

সড়কের ওপর অবৈধভাবে পণ্য বিক্রিকারী ব্যবসায়ী সৈয়দুর রহমান জানান, জায়গা না পাওয়ায় তাকে ২৫০ টাকা হাসিল বা টোল দিয়ে সড়কের ওপর বসতে হয়েছে। কোটবাজারের এক দোকানি দাবি করেন, অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে তারা সড়ক দখলের অনুমতি পান এবং নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন। ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাতায়াত থাকলেও তারা এই চরম জনদুর্ভোগের প্রতিকারে নীরব থাকেন। টাকা দিয়েই আমরা নিরাপদে ব্যবসা করছি।

কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেল বিষয়টির স্থায়ী সমাধান চেয়ে অবৈধ উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন। শাহপরী হাইওয়ে পুলিশের এসআই ফজলুল হক জানিয়েছেন, বাজার সমিতি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, সড়ক দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ ঝুপড়ি ও পার্কিং উচ্ছেদে ইতিমধ্যে কাজ চলছে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ইজারা শর্তানুযায়ী মূল্যতালিকা প্রকাশের নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। তিনি যোগদানের পর নতুন করে মূল্যতালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, যা দ্রুত প্রকাশ্যে টাঙানো হবে। বিশেষ করে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মিত এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করলেও সরকারি গাড়িতে চলাচলের সময় তাঁরা এ দুর্ভোগ উপলব্ধি করছেন না বলে স্থানীয়দের দাবি।