১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, রাত ১২:৪৬

১ কিলোতে ৭০ খুন!

অ.শুভ:

শহরের খানপুর রেললাইন এলাকায় গঞ্জে আলী খাল সংস্কার করছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন। খালের পাশেই রেলওয়ের জমিতে গত ২০ বছর ধরে বেড়ে উঠেছে কড়ই, শিমুল, চাম্বল, শীল কড়ই, খেজুর, সুপারিসহ নানা প্রজাতির গাছ। গত কয়েক দিনের মধ্যে এই গাছ গুলো কেটে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কাউন্সিলরসহ তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে। কাউন্সিলরের দাবি, খাল সংস্কারের জন্য গাছ কেটেছে। নাসিক মেয়র বলছেন, গাছের বিষয়ে জানেনা তিনি। অপরদিকে বন সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা বেআইনী ও অপরাধ।

সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫১ সালে গড়ে উঠেছিলো আদমজী জুটমিল। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এই রেলপথে পাট পণ্য আনা নেয়া হতো। ২০০২ সালের মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই রেল পথটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। নানা প্রকৃতির গাছগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিলো দীর্ঘ ২০ বছর ধরে। গত কয়েকদিন ধরে নগরীর খানপুর রেল লাইনের তল্লা এলাকা থেকে থেকে শুরু করে চাঁনমারির পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ৭০ টি গাছ গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা।

নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা বলেন, রেল লাইনের জমি দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নির্ধারিত। যেমন রেলওয়ের মাঝে যদি কালভার্ট থাকে তা হলে সেই স্থানটিতে উভয়ই পাশে ১২০ ফিট করে জমি আছে। আবার কিছু স্থানে ৬০ থেকে ৮০ ফিট জমি। তিনি আরো জানান, এই রেলপথে ১৫.০৮ কিলোমিটার আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের উত্তর চাষাঢ়ার চাঁনমারি এলাকা থেকে খানপুর তল্লা পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বাকি কয়েকটি গাছ এখনো কাটছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গাছ কাটার কাজ করছে শ্রমিকরা।

এলাকাবাসি জানিয়েছেন, এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৭০ টি অধিক গাছ ছিলো যা গত ২০ বছরের অধিক সময় ধরে বেড়ে উঠেছে। গত ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে এই গাছ গুলো কেটে ফেলেছে স্থানীয় ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাসেম শকুর লোক নবীসহ তার সহযোগীরা তারা খাল সংস্কারের নামে গাছ কেটে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।

তবে মুঠো ফোনে তা অস্বীকার করেছেন নবী হোসেন। তিনি জানান, সিটি কর্পোরেশনের জায়গা পরিস্কার করার জন্য কাছ করছেন তিনি। সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি ছাড়া কেউ গাছ কাটতে পারে না তা সবাই জানে। এখানে ৪০ টি বড় বড় গাছ ছিলো। বাকি গুলো ৩০ টির মতো ছোট চিকন গাছ। চাঁনমারির সিকসন বাড়ি এলাকার ১৪ টি গাছ কেটে নিয়ে গেছে ওই এলাকার মজিদসহ আরও কয়েকজন। সিকসন বাড়ির পর খানপুর পর্যন্ত মাসুদ মাষ্টারের লোকজন কেটেছে। বাকি এলাকা গুলোতে ছিলো খেজুর, সুপারিসহ কয়েকটি গাছ যা এলাকাবাসি নিয়ে গেছে। আমরা গাছ কাটিনি। তারা অনেকেই গাছ কেটে নেয়ার জন্য বলেছে ডিসি’র কাছ থেকে অনুমতি আছে তাদের। অনেকে ক্ষমতা দেখিয়ে গাছ নিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, গাছ কাটার বিষয়টি জেনে মেয়র দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সলর জমসের আলী ঝন্টু জানান, খানপুর থেকে চাঁনমারি পর্যন্ত পুরো এলাকার গাছ কেটে বিক্রি করে দিয়েছে কাউন্সলর শওকত হাশেম শকুর লোকজন। তারা শহরের ডন চেম্বারের ব্যবসায়ীদের কাছে গাছ বিক্রি করেছে। এখানে অনেক বড় বড় করুই গাছসহ নানা ধরনের গাছ ছিলো।

তবে গাছ কাটার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু। তিনি বলেন, কারা গাছ কেটেছে কিভাবে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে জানেন না তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওয়ার্ডের সবাই তো আমার লোক। আমরা খাল সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য কাজ করছি।

গাছ কাটার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি এডভোকেট এ বি সিদ্দিক জানান, অনেক বছর ধরে গাছগুলো সেখানে রয়েছে। একসাথে এতো গাছ থাকায় ওই এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো। ওই খানে সকালে অনেকেই হাঁটা চলে করে। এই গাছ গুলোর মালিক সরকার। সরকারি গাছ কাটা নিষেধ। তিনি বলেন, ১ কিলোমিটার এলাকায় ৭০ টি গাছ কাটা মানে ৭০ খুন করার সমান। যারা এই গাছ কেটেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনার অনুরোধ করছি নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ থেকে।

নারায়ণগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শারমীন আক্তার জানান, গাছ কাটার জন্য বন সংরক্ষন বিভাগ থেকে কোন অনুমতি নেয়নি। গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এ বিষয়ে জানতেন না তিনি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান, গাছ কাটার বিষয়টি আমরা জানতাম না। যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবো। তিনি বলেন, যদি সরকারি গাছ কাটা হয় প্রয়োজন মামলাও করা হবে। এছাড়া ব্যক্তিগত জমির গাছ কাটলে তা বন সংরক্ষন বিভাগের অনুমতি ও নিয়ম মানা হয়েছে কিনা আমরা সে বিষয়টিও দেখবো।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী জানান, গাছ কাটার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। এ বিষয়ে বলতে পারবে স্থানীয় কাউন্সিলর।

উল্লেখ্য, নগরীর ১১ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতা নিরসনে ঐতিহ্যবাহী গঞ্জে আলী খালের উপর সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খাল খনন কাজ করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। খালটি পুনঃখনন করে সৌন্দর্য বর্ধন করা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যা মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে উন্নয়নের নামে এভাবে ব্ক্ষৃ নিধন মানতে পারছেন না সচেতন মহল।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ