১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, রাত ১:০১

সব শঙ্কা কাটিয়ে পাট চাষীদের মুখে হাসি

সংবাদচর্চা রিপোর্ট: সরকারী পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণার পর বেশ চিন্তায় পরেছিলো পাট চাষীরা। সব শঙ্কা কাটিয়ে এবার হাসি ফুটেছে পাট চাষীর মুখে। মৌসুমের শুরুতেই দেশের বহুল আলোচিত সোনালি আঁশ পাটের ভাল দাম পাওয়ায় চাষী বেজায় খুশি। বর্তমানে পাটের আশ ছাড়াতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। বন্যা এবং বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে খাল-বিল। তাই এবার পাটের আশ ছাড়াতে কৃষকের সমস্যা হয়নি। চলতি বছর তারা প্রতিমণ পাট বিক্রি করছেন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে। এতে প্রতিবিঘায় শুধু পাট বিক্রি করেই কৃষক লাভবান হচ্ছেন ১৩ থেকে ১৭ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে পাটখড়ির দাম যুক্ত করলে প্রতিবিঘায় এখন কৃষকের লাভ হচ্ছে ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাটকলগুলো যথাযথ মূল্যে পাট কেনা শুরু করায় পাট চাষ করে কৃষক এবারও ভালই লাভের মুখ দেখছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাটের বাজারের যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট-বাজাওে মান ভেদে প্রতিমণ পাট বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে সারাদেশের কৃষকই এবার পাট বিক্রি করে খুব খুশি।

তিন/চার বছর ধরেই কৃষক পাটের দাম ভাল পাচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শুরুতে ১৫০০-১৬০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হলেও পরে দুই হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন তারা। পাটের বাজারের সেই উর্ধমুখী ধারাবাহিকতা এবারও বজায় রয়েছে। ফলে কৃষক মৌসুমের শুরু থেকেই পাটের দাম ভাল পাচ্ছে।

পাবনার বেড়া উপজেলার তারাপুর গ্রামের চাষী কোহিনুর জানান, গত বছর তিন বিঘা জমিতে চাষ করে ৫০ মণ পাট পেয়েছিলেন। সে সময় মণপ্রতি গড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে পাট বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবারও তিন বিঘা জমিতে আবাদ করে প্রতিবিঘায় পাট পেয়েছেন ১০ মণ করে। এই পর্যন্ত তিনি প্রতিমণ পাট বিক্রি করেছেন ২ হাজার ২০০ টাকা দরে। তিনি আশা করছেন, সব খরচ বাদে এবার তার কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাভ হবে।

জানা যায়, ক্ষুদ্র পাইকার ব্যবসায়ীরা সাইকেল ও ভ্যানযোগে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাট সংগ্রহ করছে। আবার বেসরকারী পাটকলগুলোর জন্য দূরের পাট ব্যবসায়ীরা হাটে এসে পাট কিনছেন। এ বিষয়ে কৃষকরা বলছেন, পাটের প্রস্তুতি শেষ না হতেই তাদের বাড়ি থেকে পাট সংগ্রহ করছে পাইকাররা। কৃষকের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে ১ বেল পাট ১০ হাজার টাকায় ক্রয় করছে। যার কারণে কৃষক বেশ খুশি।

সিরাজগঞ্জের পাট ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান জানান, বর্তমান বাজারে প্রতিমণ দেশী পাট ১ হাজার ৮শ’ থেকে ২ হাজার টাকা এবং তোষা পাট ২ হাজার ২শ’ থেকে ২ হাজার ৪শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটের ফলনও ভাল। পাটের বর্তমান বাজারদর ও বিভিন্ন মিলে চাহিদা থাকায় চাষীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে। বাজারদর এভাবে থাকলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

কাজীপুর থানার সোনামুখী গ্রামের পাটচাষী আব্দুল মান্নান বলেন, এবার পাটের যেমন ভাল দাম তেমনি পাটখড়িরও ভাল দাম পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, অনেকদিন পর পাট আবাদ করে লাভের মুখ দেখলাম। তিন বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছি। যে দাম আছে তাতে খরচ বাদ দিয়ে ধানের চেয়ে বেশি লাভ হবে।

চাষীরা জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে যে পরিমাণ পাটখড়ি পাওয়া যায় তা ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। মৌসুমে প্রতিমণ পাটখড়ি বিক্রি হয় ১৮০-২০০ টাকা দরে। যখন মৌসুম থাকে না তখন দাম পড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। দিন দিন দেশে পাটখড়ির চাহিদা বাড়ছে। পাটখড়ি পুড়িয়ে তার ছাই থেকে চারকোল তৈরি হয়। তারপর সেই চারকোল চীনে রফতানি হয়। চীনের পাশাপাশি বর্তমানে তাইওয়ান ও ব্রাজিলেও এটি রফতানি হচ্ছে। বিদেশে পাটখড়ির ছাই থেকে মূল্যবান নানা পণ্য তৈরি হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। এ খাত থেকে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকা। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার ধরতে পারলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সহজেই আয় করা সম্ভব। দেশে চারকোল শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। এর পর থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাটখড়ি থেকে কয়লা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছোটবড় মিলিয়ে ৪০টির মতো চারকোল ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। একটি কারখানায় দৈনিক ৫০০ মণ পাটখড়ির চাহিদা রয়েছে। জুন-জুলাই দুই মাস ছাড়া সারাবছর মিল চালু থাকে। একটি কারখানায় মাসে ১৫০-২০০ টন ছাই উৎপাদন হয়। প্রতিটন ছাই বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়।

মাগুরার মোহম্মদপুর সদর উপজেলার পারলা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, অন্যবারের তুলনায় এবার পাট ভাল হয়েছে। দেড়বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। গত বছর পানির জন্য পাট জাগ দিতে পারিনি। পাট চাষের মাঝামাঝি সময় তীব্র খরা হওয়ায় চাষ হওয়া পাটের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পরে বৃষ্টি হওয়ায় পাট চাষ ভাল হয়েছে।

এছাড়া মাগুরা ,ঝিনাইদহ সহ সারাদেশে পাট চাষীরা ভালো দাম পাচ্ছে। জানা গেছে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক পাটের বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। পাট চাষীরা দালাল চক্রের হয়রানীর শিকার না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ