আজ বুধবার, ২৫শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

শাড়ি কিনলেন প্রধানমন্ত্রী

এম.এ মোমেন

এবারের বাণিজ্য মেলায় নারীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে জয়িতা প্যাভিলিয়নের পণ্য। মেলার অন্যান্য বিদেশি কাপড়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে এ সকল দেশিয় পণ্য। তুলনামূলক ভাবে দাম কম ও মান ভালো হওয়ায় ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দে গ্রামীণ নারীদের হাতের তৈরি এসব পণ্য ক্রয় করছেন। গত ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন করে জয়িতা স্টল থেকে শাড়ি ক্রয় করেছেন। নারী উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁরা ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিনামূল্যে নারী উদ্যোক্তাদের জয়িতা প্যাভিলিয়নে স্টল বরাদ্দ দিয়েছেন। ঢাকা থেকে মেলায় আসা যাওয়ার জন্য তাদের ফ্রি বাস সার্ভিস দেওয়া হয়েছে।
মেলায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জয়িতা ফাউন্ডেশনের প্যাভিলিয়নে ২৬টি স্টল রয়েছে। এই স্টলগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে। কেনাবেচা হয় প্রচুর। এই সকল স্টলের মালিক, কর্মচারী ও প্রদর্শনী পণ্যের কারিগর সবাই নারী। জয়িতা ফাউন্ডেশনে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী উদ্যোক্তারা। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় সমর্থন ও সহায়তা করার জন্য ২০১১ সালে জয়িতা ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়।
বাণিজ্য মেলার এবারের আসরে জয়িতা স্টলে ক্রেতা দর্শনার্থীদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। লোক সমাগম আর পণ্য বিক্রিতে খুশি এ নারী উদ্যোক্তারা। সারিবদ্ধ ভাবে নানা রকমের পণ্য ক্রেতাদের দেখাচ্ছেন তাঁরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জয়িতা ফাউন্ডেশনের স্টলে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। ২৬টি স্টলের সকল নারী উদ্যোক্তা ও তাদের নিয়োজিত নারী সেলস্ম্যান সবাই ব্যস্ত। কেউ পণ্য প্রদর্শন করছেন। কেউ পণ্য ক্রেতাদের দিচ্ছেন। কেউবা ক্রেতাদের সামনে একের পর এক পণ্য তুলে ধরছেন। নিজেদের কারখানায় তৈরি শাড়ি, ওয়ান-পিস, টু-পিস, থ্রি-পিস, ওড়না, স্যালোয়ারের কাপড়, মাটি ও পাটের তৈরি সোভাবর্ধন জিনিসপত্র, দরজা-জানালার পর্দা, রানার শিট, কটি, সোফার কুশন, বালিশ কভার, টেবিলমেট, পিতলের তৈরি গৃহস্থালী পণ্য সহ তিন শতাধিক ধরণের পণ্য রয়েছে তাদের স্টলগুলোতে। এছাড়া রাজশাহী সিল্ক, জামদানি শাড়ি, বাঁশের তৈরি আসবাবপত্র, কাঁসার তৈরি গৃহস্থালি পণ্য, খেলনা, পুতুলসহ নানা প্রয়োজনীয় পণ্যের সমাহারে ভরপুর এ প্যাভিলিয়ন। গ্রামীণ নারীদের হাতের তৈরি পণ্য তরুণী ও নারীদের আনাগোনা বাড়িয়ে তুলেছে এ প্যাভিলিয়নে। এখানকার পণ্য প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। মেলার প্রথম দিকে কেনাবেচা ভালো না হলেও শেষের দশ দিন ভালো কেনাবেচা হচ্ছে। বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। যেমন মেলা জমে উঠেছে। তেমনি এখানে কেনাবেচার ধুম পড়েছে।
জয়িতা স্টলে জামা ৭০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা, শাড়ি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১৪ হাজার টাকা, ওড়না ৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা, সুতি শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, পাঞ্জাবি ৭০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ফতুয়া ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
জয়িতা ফাউর্ন্ডেশনের কর্মকর্তা ও প্যাভিলিয়ন ইনচার্জ বিদ্যাসিনহা বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের কর্মের পরিধির উপর ৫০ হাজার টাকা থেকে ৫০ লক্ষ টাকা ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে। উদ্যোক্তাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকায় ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। ওই কারখানায় গ্রামীণ নারীরাই কর্মচারী। পণ্যের কারিগর। সেখানে তৈরি করা পণ্যই মেলার স্টলে উঠানো হয়। দেশে ও বিদেশে এসকল পণ্য সমাদৃত।
জয়িতা ফাউন্ডেশনের ২৬টি স্টলে ১৬ জন অনলাইন জয়িতা অর্থাৎ ই-জয়িতা, ২৬ জন নারী বিক্রয় প্রতিনিধি ও দুইজন অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন।
জুঁই মহিলা উন্নয়ন সংস্থার প্রোপাইটর মাহমুদা খাতুন বলেন, সবাই হাতের তৈরি জিনিস পছন্দ করেন। তাই জয়িতার প্যাভিলিয়নে ক্রেতা দর্শনার্থীরা আসেন। এখানে গ্রামীণ নারীদের হাতের তৈরি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে।
নারী উদ্যোক্তা ও শাহনাজ হস্ত শিল্পের প্রোপাইটর শাহনাজ পারভীন বলেন, তিন শতাধিক ধরণের পণ্য নিয়ে জয়িতা প্যাভিলিয়ন সাজানো হয়েছে। থ্রি-পিস, নকশি কাঁথা, বেবি টায়াল, জামদানি শাড়ি, ওড়না, বাচ্চাদের পোশাক এখানে স্থান পেয়েছে। প্রতিদিনি জয়িতা প্যাভিলিয়ন মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে।
নারী উদ্যোক্তা ও সুজন মহিলা সংস্থার নাছিমা আক্তার বলেন, চাকরির পেছনে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে প্রথমে সেলাই কাজ শুরু করি। পরে জয়িতার উদ্যোক্তা হয়ে বিভিন্ন দেশের মেলায় দেশিয় পণ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করি। আমি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখন স্বাবলম্বী। তবে জয়িতা উদ্যোক্তাদের আবাসিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
শেরপুরের মফস্বল মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জিমি আরা জেনি বলেন, অভাব অনটনের মধ্যে সেলাই কাজ করে তাঁর সংসার চলছিল। পরে জয়িতার উদ্যোক্তা হয়ে চার ভাগ সুদে এক বছর মেয়াদী ব্যাংক ঋণ নিয়ে তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন। তিনি ইতিমধ্যে গ্রামীণ নারীদের হাতের তৈরি পণ্য নিয়ে নেপাল, ভারত, চায়নাসহ কয়েকটি দেশের মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। জেনি এখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। পাঁচ বছর মেয়াদী ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে পারলে উদ্যোক্তারা লাভবান হতো বলে তিনি দাবি করেন।
নারী উদ্যোক্তা ও মায়ের ডাকের সভাপতি আলমাছ পারভীন বলেন, উদ্যোক্তাদের প্রোডাকশন হাউস প্রয়োজন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জের উত্তোরণ নারী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি নাজনীন আক্তার মুক্তা বলেন, ফ্যাশন ডিজাইন, কার ড্রাইভিং ও ডে-কেয়ার সহ বিভিন্ন ট্রেডে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ পেয়েই দিন দিন মেধা আর পরিশ্রমে নারীরা উদ্যোক্তা হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী উদ্যোক্তাদের পুঁজি ও প্রনোদণা দিয়েছেন।
ঢাকার রামপুরা থেকে স্বপরিবারে মেলায় আসা গৃহবধূ মাহফুজা আক্তার বলেন, জয়িতা স্টলের পণ্য গ্রামীণ নারীদের হাতের তৈরি। মান ভালো থাকায় বেশ কিছু পণ্য ক্রয় করেছি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে স্বপরিবারে আসা ব্যবসায়ী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এবারের মেলায় তৃতীয়বারের মতো এসেছি। মেলার শুরু থেকে ক্রেতা দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে জয়িতা ফাউন্ডেশনের প্যাভিলিয়ন। সুনিপুণ ভাবে হাতের কারুকাজে তৈরি এ পণ্যের বেশি চাহিদা। ন্যায্য দাম পাওয়ায় স্ত্রী-বাচ্চাদের জন্য কিছু পণ্য ক্রয় করেছি।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ