চট্টগ্রাম বন্দর অচল হওয়ার শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

চট্টগ্রাম বন্দর

 চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : চট্টগ্রাম বন্দর অচিরেই অচল হওয়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দরে যেভাবে আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে সেভাবে সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা না বাড়ায় এ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে কনটেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ, যন্ত্রপাতি কেনা ও অবকাঠামো সুবিধা কিছুটা বাড়ানো হলেও তা পরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত নয়। একবিংশ শতাব্দীর কথা মাথায় রেখে কিংবা ৫০ বছর পরের চট্টগ্রাম বন্দর কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে হোম ওয়ার্ক করতে হবে। এর মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে। তা না হলে অচিরেই চট্টগ্রাম বন্দর অচল বা ডেডলক হয়ে যেতে পারে। নেমে আসতে পারে স্থরিবতা। এতে দেশের অর্থনীতির ওপর যে প্রভাব পড়বে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনার জট লেগেই আছে। বছরের পর বছর জট পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীদের এখন বেসামাল অবস্থা। সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পেরে তারা ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে ব্যাংক ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হচ্ছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম চেম্বার, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার, বিজিএমইএ সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন বিভিন্ন সময়ে দাবি-দাওয়া ও সুপারিশমালা দিয়ে আসছে সরকারকে। কিন্তু তাদের সেসব দাবি ও সুপারিশমালা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ আছে। যে কারণে তাদের সেসব দাবি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। লাইটার জাহাজ সংকট, ইক্যুইপমেন্ট সংকট, জেটি সংকট বন্দরের নিত্য দিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙ্গরে জাহাজ জট যেমন লেগে আছে তেমনি বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে কনটেইনার জটও নিত্যদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ৩৩ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার বিপরীতে কখনও কখনও ৪০ হাজার বা তারও বেশি কনটেইনারের উপচেপড়া জট থাকে বন্দরে। দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিকরা কখনও কখনও আন্দোলন-সংগ্রাম করলে জাহাজ ও কনটেইনার জট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। যার খেসারত দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান মতে, গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে অপেক্ষমান জাহাজের সংখ্যা ছিল ১৭৩টি। বিভিন্ন জেটিতে অবস্থানরত ছিল ৩৪টি জাহাজ। একসঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ কার্গো ও কনটেইনার জাহাজের অবস্থান অস্বাভাবিক। সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পেরে এসব জাহাজকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে একটি জাহাজ বার্থিং নেয়ার পর ১২-১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বহির্নোঙ্গরে আসার পর ২০-২২ দিন ক্ষেত্র বিশেষে এক মাস পরও একটি জাহাজ পণ্য খালাস করে ফিরতে পারছে না। যে কারণে বন্দরের বহির্নোঙ্গরে জাহাজ জট লেগে আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে গত বুধবার কনটেইনার ছিল ৩৭ হাজার ৩২৩ টি। যা ধারণ ক্ষমতার বাইরে। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি ও এফবিসিসিআই সহ সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, পণ্য খালাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে এখন প্রয়োজন অন্তত ৬০টি জেটি। কিন্তু আছে মাত্র ১৩টি। ইক্যুইপমেন্টসহ স্বয়ংস¤পূর্ণ অন্তত ৪০টি বেসরকারি ডিপো বা পোর্ট (আইসিডি) দরকার। আছে মাত্র ১৭টি। তাও সবগুলো স্বয়ংস¤পূর্ণ নয়। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম লাইটার জাহাজ আছে। নতুন কোন লাইটার জাহাজের অনুমোদন মিলছে না। এ অবস্থায় বহির্নোঙ্গর থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। যন্ত্রপাতির অভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি দেয়া হয় ধীরগতিতে। সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যত নিয়ে ব্যবসায়িরা শঙ্কিত। কারণ, চট্টগ্রামে তিনটিসহ সারা দেশে অনেক ইকোনোমিক জোন হচ্ছে। এফআইডি বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট আসারও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব হলে বন্দর বিদ্যমান অবকাঠামো সুবিধা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। চেম্বার সভাপতি আরও বলেন, যেভাবে আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে সেভাবে অবকাঠামো সুবিধা বাড়ছে না। যা বাড়ছে তা বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত। ২১০০ শতকের কথা মাথায় রেখেই বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ৫০ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দর কেমন হবে তার একটি হোমওয়ার্ক করতে হবে। সেই রোড ম্যাপ অনুযায়ী বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতে হবে। তবেই বন্দর সচল রাখা যাবে। নয়তো এই বন্দর অচিরেই ডেডলক হবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার সহ-সভাপতি এএম মাহবুব চৌধুরী বলেন, গার্মেন্টস সেক্টর এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গার্মেন্টস সেক্টরকে লাইফ সাপোর্ট থেকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বন্দরের অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গে তা অফডকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, ২০২১ সালে আরএমজি খাতে ৫০বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বন্দরের বিদ্যমান অবকাঠামো সুবিধায় কখনোই সম্ভব হবে না। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা সংক্রান্ত এক বৈঠকে সম্প্রতি নৌ পরিবহন সচিব অশোক মাধব রায় বন্দরের ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহের বিষয়ে বলেন, নৌ-মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যেভাবে এগুচ্ছে তাতে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে শতকরা ১০ভাগ ইক্যুইপমেন্ট অতিরিক্ত থাকবে।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *