১৭ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, রাত ৩:৫২

ঈদের একাল সেকাল

আনোয়ার হাসানঃ

বাড়িতে মা-খালা, চাচীরা হাসিমুখে বাড়তি খাটা খাটুনি শুরু করতো। লম্বা কাঠে ময়দা দিয়ে সেমাই তৈরী করে রোদে দিতো। পাখি তাড়ানোর দায়িত্ব ছিলো ছোটদের। ময়দা দিয়ে আরেক ধরনের সেমাই হতো। যা অনেকটা ধান বা চালের আকৃতির। হাতে কিছুটা ময়দা নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আরেক হাতের তালুতে ঘষা দিলেই ছোট আকারের এ সেমাই নীচে রাখা পাত্রে পরতো। ঈদের দিন দুধ-চিনি দিয়ে রান্না করা এ সেমাইয়ের যেমন স্বাধ ছিলো, তেমনি ছিলো সু-ঘ্রান। তবে সবচেয়ে বেশি ছিলো—- বিশ্বাস।

আজকাল নামী-দামী ব্র্যান্ডের রঙচটা প্যাকেটের সেমাইয়ে বিশ্বাস নেই। পচা-গলা সেমাই প্যাকেটে ঢুকিয়ে মানুষকে ঠকাচ্ছে এক শ্রেনীর ব্যবসায়ী নামের মুনাখাখোররা।
ঈদুল আজহা’র সবচেয়ে বড় বিষয় ছিলো কোরবানীর পশু। গরু কিংবা ছাগলের হাটের মাইকিং শুনতেই ভিড় করতো ছোটরা। বড়রাও কান পেতে শুনতো আর মাইকিং ম্যান ভরাট গলায় অবিরাম বলতো, ‘বিরাট গরু ছাগলের হাট’। হাটের সংখ্য তখন তেমন ছিলো না। হাট ইজারা নিয়ে ঝামেলাও কম ছিলো। আর গরু টানাটানিতো কল্পনাই করা যেতো না।

এখন শিডিউল বিক্রি থেকে গন্ডগোলের শুরু হয়। কোরবানির চামড়া বিক্রি পর্যন্ত তা অব্যহত থাকে। এ হাট প্রথা এ ঈদের ত্যাগের ইতিহাস ম্লান করে দিচ্ছে। মহান আল্লাহর নির্দেশে প্র্যাণ প্রিয় পুত্রকে কোরবানি দিয়ে যে প্রেম সৃষ্টি হয়েছিলো তা বুঝে না বুঝে আজ এক শ্রেনীর মানুষ লাভে মেতে উঠেছে।

ঈদের দিন সকালে নদী বা পুকুরেই গোসল করতো অধিকাংশ মানুষ। এখনকার মতো চৌদেয়ালের ভেতর গোসলখানা কম ছিলো তখন। এরপর পুরুষেরা নামাজে যেতো আর ভোর থেকে নারীরা রান্নাবান্না শুরু করতো। মাংস রান্নার জন্য পাটায় পিষে মসলা বাটা হতো। এখন প্যাকেটের গুড়ো মসলায় অভ্যস্ত বেশীরভাগ মানুষ।

কোরবানী দেয়ার পর প্রায় সব বাড়িতেই প্রথমে বড় হাড়িতে গোশত রান্না হতো। চুলোয় থাকতেই ছোটদের হাতে গোশতের টুকরো দিতো। তা পেয়েই মুখে দিতো সবাই। গরমে একবার এ হাত আরেকবার ও হাতে নিলেও মাংসের স্বাদ নিতে সবাই উৎসুক ছিলো। মায়েরাও সন্তানের এমন মাংস খাওয়ার বিষয়টি হাসি মুখে দেখতো।

তখন এত ফ্রিজ ছিলো না। তাই মাংস অনেক দিনের জন্য রাখার চিন্তাও কম ছিলো। আর এখন, ঈদুল আজহা মানে ফ্রিজ বিক্রির মৌসুম ! আবার কেনারও মৌসুম! এক শ্রেনীর মানুষ ধর্মের অন্যসব কর্মে নিজেকে যুক্ত না করলেও কোরবানি দিতে মরিয়া হয়ে উঠে। এমনকি ফরজ আদায় না করেই কেউ কেউ কোরবানি দিতে খুব উৎসাহি হয়। কারও কারও মতে, লোক দেখানো আর মাংস রাখা যায় বলে এতে বেশী উৎসাহ। এছাড়া সমাজে, অপরধাীদের হাতে বেশী টাকা। তারা নিজেকেই জাহির করতে চায়। নিয়মিত ঘুষ-সুদ খেলেও কোরবানি দিতেই হবে তাদের।

ঈদের দিন ছোটদের বেলুন-বাঁশি কিনে বড়রা। বড়দের সালাম করে সালামি পাওয়া যেতো। সকাল থেকে ঈদুল আজহার সময়ের তৈরী কাপড় কিংবা নতুন কাপড়-চোপর পরে সালামির আশায় বাড়ি বাড়ি ঢু মারতো ছোটরা। তখন বাড়িগুলো অন্যরকম ছিলো। অধিকাংশ বাড়ির সামনে খোলা জায়গা থাকতো। উঠোন পেরিয়ে ঘরে যেতে হতো।

এখন বাড়ি বাড়িতো গেট রয়েছেই একই বাড়িতে দেয়ালেরও অভাব নেই। ইটের দেয়ালের মতো মানুষের মনেও দেয়াল তৈরী হয়েছে। এক বাড়িতে থাকলেও স্বজনদের মাঝে আগের মতো আন্তরিকতা নেই।
তাইতো বড়রা সব সময়েই আক্ষেপ করে বলে, ছোট বেলার ঈদ খুব আনন্দের ছিলো। তবে অনেকে বলেন, ঈদ সব সময়েই আনন্দের। বয়সের কারনে তার তারতম্য হয়। তাইতো রাত পোহালেই ঈদকে স্বাগত জানাতে প্রস্তত সব শ্রেনীর মানুষ। গতকাল থেকে শুরু হয়েছে, ম্যাসেজে ‘ঈদ মোবারক’ বার্তা পাঠানো।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ

আজকের ছবি

Recent tabs widget still need to be configured! Add tabs, add a title, and select type for each tab in widgets area.