আজ বুধবার, ১১ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৪শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আরেকজন হারুন আসুক না.গঞ্জে

স্টাফ রিপোর্টার :
নিত্য যানজট ও অবৈধ যানবাহনের দৌরাত্ম্যে নাকাল নারায়ণগঞ্জবাসীর দৈনন্দিন জীবন-যাপন। দিনব্যাপী শহরের মোড়ে মোড়ে দীর্ঘ যানজট, অবৈধ স্ট্যান্ড, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাতে হকার। বিশৃঙ্খলা ও পরিবহন নৈরাজ্যের এই শহরে নগরবাসীর চলাচল করাও দায়। সমস্যা থাকলেও নেই কার্যকরি কোনো সমাধান। এদিকে শহরের যানজটের জন্য প্রশাসন ও ট্রাফিক বিভাগকে নিয়মিত দোষারোপ করছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনর (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এর উত্তরে প্রতিবার জনবল সংকটের দোহাই গাইছে প্রশাসন। নাসিক ও প্রশাসনের দোষারোপের মঝে পিসছে নারায়ণগঞ্জবাসী। তবে নগরবাসীদের ভাষ্যমতে, তারা নিয়মিত টেক্স দিচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। ট্রেক্স নাসিক নিলে শহরের শৃঙ্খলার দায়িত্বও নাসিকের। তাই শহরের এই বিশৃঙ্খলার ব্যর্থতা মেয়রের উপরও বর্তায়।
শহরের বিশৃঙ্খলা দিনদিন আরও অসহনীয় হয়ে পড়ছে। নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠার উপক্রম। শহরের এমন পরিস্থিতিতে বাংলার সিংহাম খ্যাত সাবেক পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদের তীব্র অভাব অনুভব করছে নারায়ণগঞ্জবাসী। কেননা হারুন অর রশিদ পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ শহরে শৃঙ্খলা ছিল। যানজটমুক্ত ছিল সড়ক, হকারমুক্ত ছিল ফুটপাত, দখলমুক্ত ছিল মীরজুলাসহ অধিকাংশ সড়ক, ছিলো না কোনো অবৈধ স্ট্যান্ড। নিয়মিতই দেখা যেত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। ফলে শহরে স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করেছে মানুষ। তার এ অবদানের জন্য নারায়ণগঞ্জবাসী তাকে উপাধী দিয়েছিলেন বাংলার সিংহাম।
হারুণ অর রশিদ নারায়ণগঞ্জ যাবার পর তার দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেতে পারেনি। যার ফলে বর্তমানে শহরের এমন বেহলা অবস্থান। শহরের বিশৃঙ্খলা, যানজট, হকার, অবৈধ যানবাহনমুক্ত করে শহরকে পুনরায় বাসযোগ্য করার জন্য আরেকজন হারুণ খুব করে চাচ্ছেন তারা। নারায়ণগঞ্জবাসীর অভিমত, আরেকজন হারুণ আসুক নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে।
সচেতন মহল বলছে, পুলিশ প্রশাসন যদি কর্মতৎপর হয়ে উঠে তবে, শহরের এসব বিশৃঙ্খলা রোধ করা সম্ভব। কিন্তু প্রভাবশালী একটি মহলের কারণে প্রশাসনও সেভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না বলেই তারা মনে করেন। তারা বলছেন, ইতোপূর্বে এসব বিশৃঙ্খলা রোধ করতে পেরেছিলেন জেলার সাবেক এসপি হারুন অর রশীদ। তাকে যমদূতের মতই ভয় পেত প্রভাবশালী মহলের মূল হোতা। যার কারণে তার সময়কার সাত মাস শহরে তেমন একটা বিশৃঙ্খলা দেখা যেত না।
তারা আরও বলছেন, পুলিশ চাইলে কী না পারে, তা কিন্তু এসপি হারুন দেখিয়ে দিয়েছিলেন। দরকার কেবল অপশক্তির বিরুদ্ধে সাহস করে ঘুরে দাঁড়ানো। কেননা, অপশক্তি কখনই সাহসী হয় না। এরা জুজুর ভয় দেখিয়ে মানুষকে কেবল শোষণই করে। এমন কথা বহুবার মেয়র আইভীও বলেছেন। তিনি এই শক্তির বিরুদ্ধে সাহস করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বলে আজ অনেকেই সাহসী হয়ে উঠেছেন।
২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর হারুন অর রশীদ নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। আসার পরপরই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন তিনি। তার সাহসী ও নির্ভিক আচরণ দাগ কেটে যায়। দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মধ্য দিয়ে নগরবাসীর মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেন এই কর্মকর্তা। তার স্বদিচ্ছায় নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও তার অবদানের কারণে তাকে বাংলার সিংহাম উপাধি দেয় সাধারণ মানুষ।
এসপি হারুণ শহরের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান করেন। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে তিনি অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, অবৈধ পার্কিং বন্ধ করেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ফুটপাত দখল মুক্ত করার লক্ষ্যে হকার উচ্ছেদ করেন। পুনরায় দখল হওয়া থেকে প্রতিরোধ করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায় পুলিশকে। প্রায় সময় হারুন অর রশিদ নিজে অভিযানে এসে সবকিছু নিজে তদারকি করেছেন। কারণে নগরবাসীর বাহবাহও পেয়েছেন তিনি।
ওই বছরের জুন মাসে শহরের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সড়ক মীরজুমলায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রাতের মধ্যে দখলমুক্ত করেন তিনি। দীর্ঘদিন দখল হয়ে থাকা মীরজুমলা সড়ক সে সময় খুব সহজেই দখলমুক্ত করে দিয়েছিলেন এসপি হারুন। এতে সচেতন মহলের কাছে প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি। জানা যায়, এসপি হারুন সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের জন্য ছিলেন আতঙ্ক। ওই সময়ে মাদক বিক্রেতারাও ভয় পেতেন। হারুন অর রশিদের সময়ে শহরে মোটরসাইকেল মহড়া ছিল না। অনেক প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসীরা ছিলেন লাপাত্তা।
হারুন অর রশিদ থাকাকালীন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন ২৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধানকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। চাঁদাবাজির অভিযোগে জাতীয় পার্টির বিতর্কিত নেতা আল জয়নালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নাসিক ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল করিম বাবু ওরফে ডিস বাবুকে চাঁদাবাজি ও তার অন্যতম সহযোগি, ডাকাতি মামলার আসামি সজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে চাঁদা দাবী করার মামলায় সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম ওরফে ছোট নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোনারগাঁও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নুর বিরুদ্ধে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ও অফিস সহকারীকে অপহরণ করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠে। অস্ত্র ও মাদকসহ সন্ত্রাসী মোফাজ্জল হোসেন চুনুপবকে গ্রেপ্তার, সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন বিরুদ্ধে মামলা, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামের বিরুদ্ধে জিডি, কথিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মীর হোসেন মীরুর বিরুদ্ধে মামলা হয়। এমপি শামীম ওসমানের একমাত্র ছেলে অয়ন ওসমানের সমন্ধী মিনহাজউদ্দিন ভিকিকে গ্রেপ্তার করেন তিনি।
সাবেক এমপি নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে শহরের আল্লামা ইকবাল রোডে একজনের ফ্ল্যাট দখলের অভিযোগ উঠে এবং ওই ফ্ল্যাট উদ্ধারও করে দেন এসপি হারুন।
ওই সময়ে সুপার হারুন অর রশিদ একাধিকবার বলেন, আমরা এখানে রাজনীতি করার জন্য আসি নাই, দল করার জন্য আসি নাই। যে সকল সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের ধরা হচ্ছে তারা হয়তো কারও ভাই বোন হতে পারে কিংবা কারও লোক হতে পারে। এতে কারও মন খারাপ হতে পারে কিন্তু আমাদের অভিযান চলবেই। আমরা সেবার মানসিকতা নিয়েই কাজ করছি। আমরা কোন গ্রুপিং কিংবা কোন দলবাজী করছি না। আমরা সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাই। এই নারায়ণগঞ্জে চাকরি করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। বিভিন্ন সেক্টরের গতিপথ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। সন্ত্রাসী, ভূমিদুস্য ৩ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কাজ করছি। নারায়ণগঞ্জে জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সকলেই আমাদের উপর নির্ভর করছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। কোন সন্ত্রাসী, কোন চাঁদাবাজ বা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে রাতের বেলা মাদক ব্যবসা করেন, দিনের বেলা কোন বড় ভাই এর সাথে দেখা করেন। এই ধরনের লোকের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিয়েছি।’
শেষে ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর হারুন অর রশিদ বদলী হন। বর্তমান অরাজক এ নারায়ণগঞ্জ শহরে আবারও মানুষ ‘একজন সিংহামের অভাব’ অনুভব করছেন।
পরোক্ষভাবে শামীম ওসমান বক্তব্যে হারুন অর রশিদের কিছুটা বিরোধীতা করলেও এমপি সেলিম ওসমান নিজে পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করেন। বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ নারায়ণগঞ্জের সাধারণ জনগণের স্বস্তির কথা চিন্তা বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যা অত্যন্ত সাহসী ও প্রশংসনীয় বলে আমি মনে করি। এজন্য নারায়ণগঞ্জের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি পুলিশ সুপারকে দোয়া করছি এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত হকার মুক্ত এবং রাস্তার পাশে অবৈধ কার পার্কিং বন্ধ করায় সাধারণ মানুষ নির্বিঘেপব ফুটপাত দিয়ে পায়ে হেটে যাতায়াত করতে পারছে। মীরজুমলা সড়কটি দখল মুক্ত করায় সেখান দিয়ে এখন রিকশা সহ যানবাহন চলাচল করছে।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ