১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, রাত ২:২২

অনেক প্রতিদ্বন্দ্বি তার

সংবাদচর্চা রিপোর্টঃ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে দলের সমর্থন পেতে কারও মুখোমুখি হতে হয়নি সেলিনা হায়াৎ আইভী কে। সে সময়ে চুনকা কন্যা হিসেবে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছিলেন তিনি। তবে সিটি করপোরেশনের দু’টি নির্বাচনে ভোটের আগেই দলের মধ্যে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি বাড়বে তার।

গত বছর ৭ সেপ্টেম্বর  শামীম ওসমানের জনসভায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মো. শহীদ বাদল ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আবার নৌকা নিতে আইসেন। এবার আর নৌকা পাইবেন না। ওই সভায় দুই বন্ধুর সাথে সুর মিলিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন শামীম ওসমান নিজেও। দলীয় সূত্র মতে, ২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনকালে দলের সমর্থন পেতে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হয়নি সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের ক্ষমতাকালে বিএনপি প্রার্থী নূরুল ইসলাম সরদারকে হারিয়ে পৌর চেয়ারম্যান হয়েছিলেন আইভী। তার এ জয় তখন দলের নেতাকর্মীদের জন্য অনেকটা টনিক হিসেবে কাজ করেছিলো বলে মনে করেন দলের অনেক সিনিয়র নেতা ও বিশ্লেষকরা। ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জের অনেক সাহসী নেতারা শহর ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছিলেন। দলের পক্ষে তাদের কাজ করাও সম্ভব ছিলো না। ওই অবস্থায় আইভীর জয় কিছুটা হলেও মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তবে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রথম নির্বাচনে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হয় আইভীকে। নির্বাচনের আগে একটি মহল প্রচার করেছিলো, পৌরসভায় উন্নয়ন করতে পারলেও ৩ টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সিটি করপোরেশনে কাজ করার মতো দক্ষতা আইভীর নেই। শেষতক আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছিলেন শামীম ওসমান। তবে ১ লাখ ১ হাজার ৩ শ’ ৪৩ ভোটের ব্যবধানে শামীম ওসমানকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন আইভী। আইভী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট আর শামীম ওসমান পান ৭৮ হাজার ৭শ’ ৫ ভোট। এ নির্বানের আগের রাতে বিএনপি প্রার্থী এডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে দলের নির্দেশে সরে যেতে হয়। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে আইভীর জয়ের পেছনে কয়েকটি কারন রয়েছে। তার মধ্যে সন্ত্রাসের বিরদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে উন্নয়ন অন্যতম।

নাসিক মেয়র হওয়ার পর আইভী উন্নয়ন কাজ আরও বাড়িয়ে দেন। তবুও ২০১৬ সালের নাসিক নির্বাচনে দলের সমর্থন পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হয় তাকে। ওই সময়ে শামীম ওসমান নিজে প্রার্থী না হলেও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে সমর্থন দেন। এছাড়াও সহ সভাপতি চন্দন শীল সহ আরও কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে শেষতক আইভীকেই বেছে নেয় আওয়ামী লীগের সভানেত্রি শেখ হাসিনা। নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র হন সেলিনা হায়াৎ আইভী।

১ বার পৌর চেয়ারম্যান আর ২ বার সিটি মেয়র হয়ে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন আইভী। তার আমলে শহর ও আশপাশে ড্রেন নির্মাণ হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো জলাবদ্ধতার শিকার হতে হয় না নারায়ণগঞ্জবাসীকে। মদনগঞ্জে ১শ’ ফুট রাস্তা নির্মাণ, শহরের জিমখানায় শেখ রাসেল পার্ক, বাবুরাইল লেকসহ বিভিন্ন উন্নয়নে তার প্রতি মানুষের অন্যরকম ভালোবাসা জন্মেছে। তার কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের কোন অভিযোগ না থাকলেও দলের একটা অংশ তাকে সব সময় বিব্রত করতে ব্যস্ত থাকে। অভিযোগ রয়েছে, তারা নিয়মিত আইভীর বিরোধীতা করে। হকার ইস্যু থেকে শুরু করে উন্নয়নেও বাধা দেয়। এদিকে আগামী নির্বাচনে যেন আইভী দলের মনোনয়ন না পান সে ব্যাপারে তৎপর রয়েছে দলের ওই অংশটি। তবে এ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না আইভী অনুসারীরা। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। এ দলে অনেক নেতাকর্মী রয়েছে। সে কারনে প্রতিদ্¦ন্দ্বি বেশী।

সূত্র মতে, এবার আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বি হতে অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন। এরমধ্যে এমপি শামীম ওসমান এর স্ত্রী সালমা ওসমান লিপি রয়েছেন। যদিও তার পারিবারিক সূত্র জানায়, বিষয়টি পছন্দ নয় সেলিম ওসমানের। তিনি চাননা, তাদের বাড়ির কোন নারী সদস্য নির্বাচন করুক।

এদিকে বিএনপি থেকে আগে মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানের নাম শোনা গেলেও এবার তার সাথে যোগ হয়েছে মহানগর যুবদলের সভাপতি মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের খোরশেদ এ পর্যন্ত তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। করোনাকালে তার কর্মকান্ড জেলা ছাড়িয়ে গোটা দেশ এমনকি বিদেশেও প্রশংসিত হয়। খোরশেদের এ জনপ্রিয়তাকে বিএনপি লুফে নিতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহার নামও শোনা যাচ্ছে। দলীয় সূত্র জানায়, অনেক দিন ধরে এক পদে থাকায় এবার দলীয় পদ নাও পেতে পারেন খোকন সাহা। সে কারনে তিনি সিটি মেয়র মনোনয়ন চাইতে পারেন। যদিও এর আগে নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের এমপি হতে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন এ নেতা।

দলীয় সূত্র আরও জানায়, আইভীকে ঠেকাতে উত্তরপন্থিরা আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তারা একজোট হয়ে শেষ পর্যন্ত একজনকে বেছে নিবে। এ ক্ষেত্রে আইভীর বিরুদ্ধে তারা কেন্দ্রে কিছু অভিযোগও দেয়া শুরু করেছে বলে সূত্রটি জানায়। মেয়র হিসেবে সফল হলেও আইভী দলীয় কর্মকান্ডে তেমন উৎসাহী নন। দলের নেতাকর্মীদের কাছে টানেন না এমন সব অভিযোগ কেন্দ্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাছে বলা হয়েছে।

 বিশ্লেকরা বলছেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা রাজনীতির একটা কৌশল। এ কৌশল কেউ কাজে লাগাতে পারেন কেউ পারেন না।

দলের জেলা পর্যায়ের এক শীর্ষ নেতা বলেন, তৃণমূল থেকে পছন্দের প্রার্থীর তালিকা হয়তো চাওয়া হবে তবে শেষতক সিদ্ধান্ত নিবে দলের শীর্ষ নেতারা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান ওই নেতা। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ শামীম ওসমানের নির্দেশনায় মেয়র পদে যে তিনজনের নাম দিয়েছিলো তার মধ্যে আইভীর নামই ছিলো না। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আইভীর হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেন।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ