রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এনামুল হাসান (৩৯) জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বছরখানেক আগে এক দালালের মাধ্যমে সাড়ে ১১ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। এরই ধারাবাহিকতায় নিকুঞ্জ এলাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে স্পেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই শেষ পর্যন্ত তার জন্য বিপদ ডেকে আনে। সচ্ছল জীবনের আশায় বিদেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা অনেক দিনের। বিদেশ যাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পরে তিনি মোবাইলে জানান, তিনি দুবাইয়ে আছেন এবং সেখান থেকে মরক্কো হয়ে তাকে স্পেনে নেওয়া হবে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের ভাষ্যমতে, স্পেনে পাঠানোর কথা বলে সংঘবদ্ধ একটি চক্র তাকে কৌশলে কয়েক দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। গত ৭ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তিনি ওই চক্রের কবলে। অপহরণকারীরা নিয়মিত মোবাইল ফোনে কল ও বার্তা পাঠিয়ে তাকে মুক্তি করার বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করছে। তারা যোগাযোগের জন্য বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরের সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে স্পেনে যাওয়ার উদ্দেশে ৭ অক্টোবর রাতে খিলক্ষেতের বাসা থেকে বের হন এনামুল হাসান। সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা তার আগ্রহ কাজে লাগিয়ে স্পেনে কর্মসংস্থানের নামে ফাঁদ পাতে। বুধবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও ভুক্তভোগী যুবকের স্ত্রীকে বার্তা পাঠিয়ে এমএফএস নম্বরে টাকা দাবি করে। তারা দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বরও দেয়।
এ ঘটনায় স্ত্রী হেপি আক্তার খিলক্ষেত থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে বিষয়টিকে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিবদ্ধ করেছে। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এনামুল তেঁতুলতলা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছেন। অথচ পরিবার শুরু থেকেই অপহরণের বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করে আসছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, অপহরণকারীদের কবলে থাকা এনামুলকে উদ্ধারে পুলিশ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমনকি খিলক্ষেত থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমান উল্টো তাদের অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ভুক্তভোগীর চাচা জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, এসআই সাইদুর তাদের থানায় ডেকে নিয়ে অপরাধীদের সাথে সমঝোতা করে টাকা দিয়ে এনামুলকে ছাড়িয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, এনামুলকে উদ্ধারে পুলিশের ভূমিকা নির্বাক দর্শকের মতো। উলটো অভিযোগ প্রত্যাহার করে চক্রের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছে। আবার টাকা দিলেই যে মানুষটাকে নিরাপদে ফেরত পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অভিযুক্তদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, রিয়াজ, হারুন ও সায়মনের নাম উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। ১৫ ও ১৬ অক্টোবর চক্রটি ফোন করে প্রথমে ১৯ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত অর্থ না দিলে এনামুলকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৮ অক্টোবর পুনরায় ফোন করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দাবি করে তারা। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি আপাতত ২ লাখ টাকা পাঠানোর জন্য অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করছে। এরপর ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় অপর একটি নম্বর থেকে ফোন করে ফের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে হুমকি দেওয়া অব্যাহত রাখা হয়।
চক্রের সদস্যরা স্থানীয়ভাবে অবস্থান করে বাংলাদেশি নম্বর থেকে কল করলেও পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করছে না বলে পরিবারের অভিযোগ। উল্টো ভুক্তভোগী বর্তমানে দুবাই বা লিবিয়ায় অবস্থান করছেন বলে পুলিশ দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআই সাইদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
হেপি আক্তার জানান, অপহরণকারীরা বারবার তাকে অডিও বার্তা পাঠিয়ে জিডি তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে। এরপরও তিনি অভিযোগ প্রত্যাহার না করে বরং স্বামীকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। চক্রটির হাত থেকে স্বামীকে উদ্ধারের জন্য তিনি আকুল আবেদন জানিয়েছেন। হেপি স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে আকুতি জানিয়ে বলেন, যে কোনো উপায়ে তার স্বামীকে খুঁজে বের করতে হবে।