ফুটবল ইতিহাসে সম্ভবত এর চেয়ে বড় বিশৃঙ্খলার নজির নেই। ফুটবল–ইতিহাসে কোনো ম্যাচে এমন ভয়াবহ মারামারি হয়েছে কি না, সেটা সত্যিই গবেষণার বিষয়।
ব্রাজিলের মিনাস গেরাইসে অনূর্ধ্ব-২০ রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপে উবেরলান্দিয়া ও মামোরের মধ্যকার ম্যাচে যে নজিরবিহীন মারামারির ঘটনা ঘটেছে, তা বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। ব্রাজিলের মিনাস গেরাইসে অনূর্ধ্ব–২০ পর্যায়ে রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে গত রোববার উবেরলান্দিয়ার মুখোমুখি হয় মামোরে।
ম্যাচে মোট ৫৩ জন খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং ক্লাব অফিশিয়ালকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন রেফারি ফার্নান্দো প্যাট্রিক মোদেস্তে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০১১ সালে আর্জেন্টিনার এক ম্যাচে ৩৬টি লাল কার্ডের। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস তৈরি হলো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এর আগে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ৩৬ লাল কার্ড দেখা গেছে। সেটা ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার পঞ্চম বিভাগে ক্লাব আতলেতিকো ক্লাইপোলে ও ভিক্টোরিয়া আরেভাসের মধ্যকার ম্যাচে। এথেন্সকে স্তব্ধ করে রিয়ালকে জেতালেন ভালভের্দে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরুর সাত মিনিট পর, যখন উবেরলান্দিয়ার খেলোয়াড় লুইকে বিস্পো দো সান্তোসকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। এই সিদ্ধান্তের পরপরই ক্লাবটির তিন স্টাফ মাঠে ঢুকে রেফারিদের ওপর চড়াও হন। তাঁরা রেফারিকে হুমকি দিয়ে বলেন, আজ এখান থেকে বের হতে পারবে না। তাঁদের একজন হুমকি দেন যে, পুলিশ দিয়েও রেফারিকে মাঠের বাইরে বের করা সম্ভব হবে না এবং তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর ম্যাচটি ৪০ মিনিটের জন্য স্থগিত রাখতে বাধ্য হন রেফারি। দেখি তোকে পুলিশ পাহারা দিয়ে বের করতে পারে কি না। আমাদের ক্ষতি করতেই তোমরা এখানে এসেছ। বাইরে তোকে দেখে নেব, শুধু তুই আর আমি, তোকে আমি খুন করব।’।
রেফারির ম্যাচ রিপোর্ট অনুযায়ী, গোল উদ্যাপনের সময় মামোরের এক খেলোয়াড় প্রতিপক্ষ বেঞ্চের দিকে উসকানিমূলক অঙ্গভঙ্গি করেন। এর জের ধরে উবেরলান্দিয়ার কোচিং স্টাফদের একজন মাঠে দৌড়ে এসে খেলোয়াড়কে ধাক্কা মারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপরই দুই দলের খেলোয়াড় ও স্টাফরা পূর্ণাঙ্গ হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। রেফারির পক্ষে সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে শারীরিকভাবে ৫৩টি লাল কার্ড দেখানো সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে উবেরলান্দিয়ার ২৪ জন এবং মামোরের ২৯ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মিনাস গেরাইস ফুটবল ফেডারেশন প্রকাশিত ও রেফারির ম্যাচ রিপোর্ট অনুযায়ী, মামোরে দ্বিতীয়ার্ধে যোগ করা সময়ের ৯ মিনিটে প্রায় সব কটি লাল কার্ড দেখানো হয়। দুই দলের স্কোয়াড এবং কোচিং স্টাফ থেকে বহিষ্কৃত অন্য ৪৬ জনের সঙ্গে সেই দুজনকেও ‘প্রতিপক্ষকে ঘুষি ও লাথি মারা’র দায়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করা হয়। লিভারপুলকে হারিয়ে ১৮ বছর পর জয় ফেনেরবাচের। সেই খেলোয়াড় বলছিলেন, ‘মশকরা করছেন নাকি।
ম্যাচটিতে মামোরে ৩-১ গোলে জয়ী হয়েছিল। খেলা পুনরায় শুরুর ১৫ মিনিট পর, ফাউলের প্রতিবাদ জানিয়ে চিৎকার করে এগিয়ে আসায় মামোরের এক খেলোয়াড়কে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এর এক মিনিট পর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে পেটে ঘুষি মারার অভিযোগে উবেরলান্দিয়ার আরেক খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেন। গোলমালের সময় স্টেডিয়ামের ছয়জন বলবয়ও খেলোয়াড়দের ওপর লাথি ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। মামোরের ৩–১ গোলে জয়ের এ ম্যাচে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন দুই দলের খেলোয়াড় ও স্টাফরা। রেফারি ফার্নান্দো প্যাট্রিক মোদেস্তের ম্যাচ রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই দল মারামারিতে জড়িয়ে পড়ার পর মোট ৪০ জন খেলোয়াড় ও ৮ জন স্টাফকে লাল কার্ড দেখান রেফারি ফার্নান্দো প্যাট্রিক মোদেস্তে। সব মিলিয়ে লাল কার্ড দেখেন দুই দলের মোট ৪৩ খেলোয়াড়, ৮ কোচিং স্টাফ এবং ২ জন ক্লাব অফিশিয়াল।
রেফারির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উবেরলান্দিয়ার একজন স্টাফ খেলোয়াড়দের লাথি মারার পাশাপাশি ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে মামোরের পানির কুলার, ম্যাসাজ ব্যাগসহ অন্যান্য সরঞ্জাম স্টেডিয়ামের নর্দমায় ফেলে দেন। একই সঙ্গে, মামোরের খেলোয়াড়রা যে ড্রেসিংরুমে ছিলেন, সেটি তারা নিজেরাই ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাবের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পুরো ঘটনায় রেফারির নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ফেডারেশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।