, ,

নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে দিশাহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের আকাশচুম্বী দাম শুনে অনেকেরই খালি হাতে ফেরার দশা হয়েছে। সন্তানদের পছন্দের খাবার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে দিশাহারা অনেক পরিবার। কোনো কোনো সংসারে মাছ-মাংস এখন বিলাসিতা, আবার অনেকের নিত্যদিনের ভরসা কেবল চাল, ডাল আর আলু। এমনকি সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ কেনার টাকাও অনেক অভিভাবকের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সংসারের খরচ মেটাতে খাবার তালিকায় কাটছাঁট করেও মাস শেষে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য। সংসারের খরচ সামলাতে কেউ কমিয়েছেন খাবারের পরিমাণ, কেউ বাদ দিয়েছেন প্রয়োজনীয় পণ্য। কমছে খাবারের বৈচিত্র্য, সঞ্চয়ে পড়ছে টান, অপূর্ণ থাকছে সন্তানের আবদার। রিফাত বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায় প্রভাব পড়েছে। সংসারের টানাপোড়েনের সবচেয়ে নির্মম চিত্র উঠে আসে এক মধ্যবয়স্ক বাবার কথায়।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে নিম্নবিত্তের মতো মধ্যবিত্তরাও চরম সংকটে পড়েছেন। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে একদিকে বাড়তি বাজারের খরচ, অন্যদিকে যাতায়াত ও রান্নার জ্বালানিসহ অন্যান্য ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেরই আয় বাড়েনি, বরং পেশাভেদে উপার্জন কমে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ফলে বিলাসিতা তো দূরের কথা, মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

কারওয়ান বাজারের একাধিক ক্রেতা ও বিক্রেতার সঙ্গে আলাপ করে নিত্যপণ্যের এই সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে। তাদের মতে, শুধু বাজারের হিসেব নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে এসেছে। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা প্রায় তিন হাজারে নেমেছে। ব্যবসা ও সংসার চালাতে তাকে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু ত্যাগ করতে হচ্ছে। তিনি জানান, কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে সীমিত আয়েও চলতে পারতাম। কী করব, তিনটা সন্তান আছে, সংসার তো চালাতে হবে।’।

রাস্তার ধারের দোকানি মিজানের ভাষ্যমতে, নিম্নমধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট করছেন। মিজান বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্তরা বেশি কষ্টে আছি।

দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় ৮০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় খাবারের খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। আবেগের জায়গা থেকে সব সময় যেটা খেতে অভ্যস্ত, সেটাই খেতে চাই।

তার মতে, অতি নিম্নবিত্তরা সাহায্য পাওয়ার সুযোগ পেলেও মধ্যবিত্তদের সে সুযোগ নেই। অতি নিম্নবিত্তরা কারও কাছে হাত পাততে পারে, কিন্তু আমরা তো পারি না।

এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক দম্পতি জানান, বাজারে প্রবেশ করলেই কমপক্ষে দুই হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়, যা তাদের বেতনের অর্ধেকেরও বেশি।

মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা বেতন পেয়েও যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে তারা দিশাহারা।

পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফ বলেন, পণ্যের দামের একটি সহনীয় সীমা থাকা জরুরি, যা এখন আর নেই। বাধ্য হয়েই তারা নিজেদের চাহিদায় আপস করছেন। খুচরা বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। আগে ১২০-১২৫ টাকায় পাইকারিতে কেনা পাম তেলের দাম এখন ১৮৫-১৮৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। মাছ বিক্রেতা শাকিলের মতে, কয়েক বছর আগেও ৩০০ টাকার মধ্যে ভালো মানের বাজার করা যেত, এখন শুধু সবজি কিনতেই ৫০০ টাকা লাগে। খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, ক্রেতারা আগের মতো কেনাকাটা করছেন না। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো পরিমাণে বাজার করা যেত।

দিনমজুর আমীন আলীর কষ্টের কথা আরও করুণ। কাজ কমে যাওয়ায় তার আয় ৪-৫ শ টাকায় নেমেছে। তিনি জানান, ৮০০ টাকা কেজি দরের গরুর মাংস এখন তার সাধ্যের বাইরে। তার মতে, কেবল চাল, ডাল, তেল ও আলুর দাম সহনীয় হলে গরিব মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেত। রান্নার জ্বালানি সংকটে অনেককে কাঠের চুলা বা কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন সংকটে অনেক বাবা সন্তানের দুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আয় মেটাতে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকেও কাজে পাঠাচ্ছেন অনেকে। একেবারে খাওয়া বন্ধ করার সুযোগ নেই, তাই কমিয়ে-বাড়িয়ে খেতে হচ্ছে।’। আমার আয় যদি ছয়-সাতশ টাকা হয় আর গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা, তাহলে এক কেজি গরুর মাংস কিনলে চাল-তেল কিনব কিভাবে।’। গরুর মাংসের কথা উঠতেই আক্ষেপ ঝরে তার কণ্ঠে।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন জানান, বাড়তি দামের চাপ সামলানোর ক্ষমতা সচ্ছলদের থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের নেই।

বিশেষ করে গ্যাস সংকট সত্ত্বেও নিয়মিত বিল পরিশোধের বিষয়টি জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। এদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, পরিবহন খরচ ও পণ্য হাতবদলের কারণে দাম বাড়ছে। তবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না, তা অধিদপ্তর পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।