, ,

দেশের নৌপথে বাড়ছে দস্যুতা ও চাঁদাবাজি

নদীপথে অপরাধের বিস্তার ও প্রাণহানি

দেশের অভ্যন্তরীণ জলপথে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ক্রমাগত বাড়ছে। মাছ ধরার সময় দস্যুদের গুলিতে জেলেদের প্রাণহানি ঘটছে, আবার চাঁদা দাবিমতো না পাওয়ায় নৌযান শ্রমিকদের ওপর কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংস হামলা চালানো হচ্ছে। এছাড়া মাঝনদী থেকে পণ্যবাহী কার্গো ও বাল্কহেড থেকে সারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। রাত নামলেই এসব দুর্গম চরাঞ্চল ও মোহনায় তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। এতে জেলে, নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকেন। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। চাঁদা না দিলে হামলা, আক্রান্ত পুলিশও। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর সংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে। নৌযানে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডও নদীপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহন নামের বাল্কহেডের শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌ পুলিশ কাজ করলেও অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে কর্মকর্তা ও সদস্যরা নিজেরাও সশস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছেন। অপরাধ দমনে বিশাল এই নদীবেষ্টিত অঞ্চলে নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

মামলা ও পরিসংখ্যানের চিত্র

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সারা দেশের নদীসীমানাকে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সুবিধার্থে মোট ১১টি স্বতন্ত্র অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। এসব আওতাধীন এলাকায় হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, বেআইনি অস্ত্র বহন, চোরাচালান, অবৈধ পন্থায় বালু উত্তোলন, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং মাদকের মতো অপরাধে মামলা দায়েরের হার ঊর্ধ্বমুখী। ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল ২ হাজার ৮৫টি।

এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৯৯টিতে। কেবল এক বছরের ব্যবধানেই কেস বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) কেবল হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর মতো গুরুতর ৫টি অপরাধেই নতুন করে ৫০৫টি মামলা যুক্ত হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে দুই বছর ৯ মাসে মোট দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা পৌঁছেছে ৫ হাজার ৯৮৯টিতে। আগের দুই বছরের উল্লিখিত সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের ৯ মাসের এই ৫ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা।

ভোলায় জেলে হত্যা ও ডাকাতির বিবরণ

ভোলা জেলার সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের অদূরে মেঘনা নদীতে গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে মাছ ধরার সময় একদল সশস্ত্র জলদস্যু ডাকাতির চেষ্টা চালায়। জেলের দল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইলে ডাকাতেরা সরাসরি গুলি ছুড়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর এলাকাঘেঁষা পদ্মা নদীতে এমন অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য।

  1. গুলিবর্ষণের ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে প্রাণ হারান।
  2. জলদস্যুদের ছোঁড়া গুলিতে আব্বাস (৩২) ও কাঞ্চন (৩৪) গুরুতর আহত হন।
  3. একই ঘটনায় সোহেল (২৯) নামের আরও এক জেলে গুলিবিদ্ধ হন; তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদরের বাঘার হাওলা গ্রামে।

নৌ পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে এই নজিরবিহীন গুলিবর্ষণের পর গোটা অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম ভীতির সঞ্চার হয়, যা তাঁদের স্বাভাবিক জীবিকা অর্জনকে ব্যাহত করছে।

শ্রমিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, বেশ কয়েকটি জেলার সীমান্তবর্তী নদীপথগুলোতে মূলত জলদস্যুদের উপদ্রব বেশি। তবে বিশেষ কিছু মৌসুমে কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ তত্পরতা বৃদ্ধি পেলে অপরাধ সাময়িক কমে আসলেও পরবর্তীতে চরাঞ্চলের দুর্গম স্থানে জেলেরা ফের অরক্ষিত হয়ে পড়েন। মৎস্যজীবীদের জানমালের নিরাপত্তায় তখনো কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার রাখা দরকার।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক উল্লেখ করেন, প্রশাসনিক নথিতে যেসব অপরাধ উঠে আসছে, বাস্তবে তার বাইরেও বহু ঘটনা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নদীনির্ভর অপরাধের ধরন দিন দিন জটিল হচ্ছে। কেবল প্রথাগত টহল দিলেই এটি বন্ধ হবে না, বরং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিং ও সমন্বিত নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

নৌযানে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও পুলিশের ওপর হামলা

নৌপথে বাণিজ্যিক কার্গো ও সাধারণ ট্রলার থেকে নিয়মিত বিরতিতে চাঁদা তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন পয়েন্টে থামিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। রাজি না হলে শ্রমিকদের ওপর দেশি অস্ত্র নিয়ে চড়াও হচ্ছে দুর্বৃত্তরা। একইসঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে বা চাঁদাবাজদের ধরতে গিয়ে নৌ পুলিশের একাধিক সদস্য মারাত্মকভাবে জখম ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল। এ ছাড়া গত ১৯ আগস্ট বিকেলে পিরোজপুরের কাউখালীতে নদীতে টহল শেষে ফেরার পথে নৌ পুলিশের কনস্টেবল জাকির হোসেনকে ছুরিকাঘাত ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা। এতে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন।

নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, জলপথের অপরাধীদের চিহ্নিত করতে ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা ও মামলা পরিচালনায় কিছু ভৌগোলিক জটিলতা থেকে যায়। তা সত্ত্বেও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। খুলনার নদ–নদী থেকে এক বছরে ৫০ লাশ উদ্ধার।

অঞ্চলভিত্তিক অপরাধের প্রবণতা

নৌ পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অপরাধের দিক থেকে চাঁদপুর অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। টানা দুই বছর ধরে সেখানে সর্বাধিক মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর ও রাজশাহী অঞ্চলেও মামলার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। চলতি বছরের ৯ মাসে কেবল গুরুতর ৫টি অপরাধের হিসাব ধরলে ঢাকা অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। স্রোতে ভাসে অপরাধের চিহ্ন, পচন ধরে মরদেহে।