আজ , ,

তিতুমীর কলেজে শিক্ষক হয়ে ফেরা আল আমীন এখন যুক্তরাষ্ট্রে

একদিন যে ক্লাসরুমে বসে গণিত শিখেছেন, সেখানে শিক্ষক হয়ে ফিরে আসার কথা কখনো কল্পনা করেননি মো. আল আমীন মিয়া। কিন্তু গণিতের প্রতি তাঁর গভীর ভালোলাগা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাঁকে সেই গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। ছাত্রজীবনে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতা নিয়মিত পড়তেন তিনি। অন্যের সাফল্যের গল্পগুলো তখন তাঁকে নিজের জীবন নিয়েও বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাত। সেই আল আমীন আজ নিজেই অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন। কঠিন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারার আনন্দ তাঁকে টানত।

আল আমীনের শিক্ষাজীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে সরকারি তিতুমীর কলেজে। এই কলেজেই গণিত বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে নিজের প্রিয় শিক্ষাঙ্গনেই শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন। পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক শিক্ষকদের সহকর্মী হিসেবে পাওয়া—এক অন্য রকম অনুভূতি। পিএইচডি শেষে গবেষণাকে আরও গভীর পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান।

শিক্ষাজীবনের শুরুতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও পছন্দের বিষয়ে পড়ার সুযোগ না পাওয়ায় তিনি আপস করেননি। তবে পছন্দের সাবজেক্ট না পাওয়ায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের জন্য অপছন্দের বিষয়ে পড়তে চাননি। ধূসর টি-শার্ট থেকে বিলাসবহুল ফ্যাশনে, মার্ক জাকারবার্গের বদলে যাওয়া স্টাইল। মানবজাতির যাত্রাপথ চিরতরে বদলে যাবে, বলছেন নোবেলজয়ী চিকিৎসক।

গণিত নিয়ে পড়ার আগ্রহ থেকেই তিনি তিতুমীর কলেজকে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই কলেজে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল অন্যরকম। তিনি অনুভব করেন, একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেখান না, বরং শিক্ষার্থীর চিন্তা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার কারিগর হিসেবে কাজ করেন। তাঁর ক্লাসে অনেক সময় গণিত বিভাগের বাইরের শিক্ষার্থীরাও আসতেন, যেখানে তিনি গণিতের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গড়ার নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। আসতেন মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও।

শিক্ষার্থীদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে আল আমীন বলেন, ‘আমি তাদের সবসময় বলতাম, আমিও একসময় এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি বিসিএসে টিকেছি, ব্যাংকেও চাকরির সুযোগ পেয়েছি। কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, তা আপনার ভবিষ্যতের সীমানা নির্ধারণ করে না। বড় স্বপ্ন দেখলে তা পূরণ করা অবশ্যই সম্ভব।’ তুমি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছ, সেটা তোমার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে না।

শিক্ষকতা করার সময় গবেষণার প্রতি আল আমীনের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তিনি গণিতের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, অপটিমাইজেশন ও কম্পিউটেশনাল সায়েন্সের যোগসূত্র নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন এবং শেষ পর্যন্ত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার আমন্ত্রণ পান। এর মধ্যে তিনি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি (ইউটিআরজিভি)-এর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেস প্রোগ্রামটিকে বেছে নেন।

বর্তমানে তিনি সেখানে পিএইচডির পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর বর্তমান গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো গাণিতিক অপটিমাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রোবটকে পরিবর্তনশীল পরিবেশে আরও নিরাপদ ও দক্ষ করে তোলা। এ বিষয়ে আল আমীন বলেন, ‘শিল্পকারখানা, গুদাম ও হাসপাতালের মতো জায়গায় স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। মানুষের সাথে একই পরিবেশে রোবটের চলাচল নিরাপদ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো মডেল প্রথমবার ব্যর্থ হলেও হাল ছেড়ে না দিয়ে নতুন নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করাই গবেষণার শিক্ষা।’

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশেরই নিজস্ব ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে গবেষণার অবকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক অনেক বেশি। বাংলাদেশের গণিত শিক্ষাকে আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করার পরামর্শ দেন। কলেজপড়ুয়া দুই ভাই কীভাবে পেলেন ৩০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ।

ভবিষ্যতে পিএইচডি শেষ করে গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার ইচ্ছাও তাঁর রয়েছে। ছোটদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, ‘নিজের শুরুকে কখনোই ছোট করে দেখবেন না। আপনি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন, সেটিই আপনার শেষ পরিচয় নয়।’ মফস্বলের কোনো শিক্ষার্থী যদি তাঁর এই গল্প পড়ে একবারও বলে ওঠে, ‘আমিও পারব’, সেটিই হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আরও পড়ুন: , , , , ,