চট্টগ্রামে পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে এক দিনে এক লাখ চারা রোপণের এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেলার ১৬টি উপজেলা ও নগরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ একযোগে এ সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন। এ উদ্যোগকে সারা দেশের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধান অতিথি ও জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। তিনি অন্য সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদেরও নিজ নিজ প্রশাসনিক এলাকায় এ ধরনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানান।
মঙ্গলবারে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় সকালে নগরের জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে, যেখানে উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ একটি নারকেলের চারা রোপণ করেন। দিনভর চট্টগ্রামজুড়ে বিস্তৃত এ কার্যক্রম শেষে সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটসংলগ্ন ডিসি পার্কে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপদেষ্টার হাতে এক লাখতম চারা হিসেবে আরেকটি নারকেলের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
কর্মসূচির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘নানা দাবির মুখে আমরা প্রায়ই আন্দোলন করি, কিন্তু আজকের এই ১৫ হাজার মানুষের উপস্থিতি ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন। এটি আমাদের নিজেদের এবং আগামী প্রজন্মের টিকে থাকার লড়াই।’ তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতেই ‘এক দিনে লক্ষ বৃক্ষ, সবুজ পরিবেশ আমাদের লক্ষ্য’ প্রতিপাদ্যে এ বিশাল উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘গাছ লাগালাম, কিন্তু সেগুলো বেঁচে থাকল না—তাহলে আমাদের সমস্ত উদ্যোগ নিষ্ফল হয়ে যাবে।’।
এক লাখ চারা সংগ্রহ, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো এবং গর্ত খোঁড়ার মতো বিপুল প্রস্তুতিকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক জানান, সেনাবাহিনী, বন বিভাগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রোপণের আগের দিন সন্ধ্যার মধ্যেই সব গর্ত তৈরির কাজ শেষ করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন একাই ৪০ হাজার চারা সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসমূহ ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চারা সংগ্রহ করা হয়, যার ফলে সরকারের কোনো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ছাড়াই পুরো কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোও এ উদ্যোগে সহায়তা করেছে।
ভৌগোলিক পরিবেশ ও চারার স্থায়িত্ব বিবেচনা করে গাছের প্রজাতি বাছাই করা হয়। যেমন—উপকূলীয় এলাকার পরিবেশের কথা ভেবে সন্দ্বীপে ১ হাজার নারকেলগাছ এবং আনোয়ারা উপজেলায় ২০ হাজার গাছ রোপণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শুধু গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চারাগুলো বাঁচিয়ে রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, গাছ বেঁচে না থাকলে সব পরিশ্রমে ভাটা পড়বে। সে লক্ষ্যে চারা রক্ষায় বেড়া দেওয়ার পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শিক্ষক, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও গ্রাম পুলিশকে যুক্ত করে এবং বন বিভাগের কারিগরি সহায়তায় তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। চারা নষ্ট বা দুর্বল হলে দ্রুত প্রতিস্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার চারা আগে থেকেই মজুত রাখা হয়।
জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা মোটেও অসম্ভব বা উচ্চাভিলাষী নয়, বরং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি অর্জন সম্ভব। তবে তিনি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় না থেকে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে চারাগাছ পরিচর্যা ও সুরক্ষার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিধস ও পাহাড়ধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ-পরবর্তী পদক্ষেপের বদলে আগে থেকেই স্থায়ী ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
ভবিষ্যৎ নগর ও গ্রামীণ উন্নয়নের বিষয়ে আলোকপাত করে জেলা প্রশাসক যোগ করেন, মানুষের সুবিধার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলবে, তবে সেই উন্নয়ন যেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি না করে এবং বিদ্যমান বনাঞ্চল যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি কর্নেল খলিল উল্লাহ, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। এছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্ট সদস্য, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা এ কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
উল্লেখ্য, এর আগে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা দুই মাসে ১ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য পূরণ করেছিলেন। ২০২৫ সালের ১০ মে শুরু হওয়া সেই ঐতিহাসিক কর্মসূচি একই বছরের ১০ জুলাই সাইনবোর্ড এলাকায় সড়কদ্বীপে এক লাখতম কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।