সংবাদচর্চা রিপোর্ট
পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগ; এমন গুঞ্জন ছিলো শুরু থেকেই। তবে সময় গড়াতেই শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে এই গুঞ্জন রূপ নিচ্ছে বাস্তবতায়।
নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলটির স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দায়িত্বশীলদের কণ্ঠে এই অভিযোগ শোনা গেছে প্রকাশ্যেই।
বিএনপি নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির এই আন্দোলনকে পুঁজি করে পরিকল্পিত ভাবেই আড়াল থেকে ‘দাবার’ চাল চালছে আওয়ামী লীগ নেতারা। শ্রমিকদের উস্কে দেয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অনুপ্রবেশ করিয়ে চালানো হচ্ছে নাশকতা।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকগণ সহ অন্যান্য পর্যায়ের নেতারা গা ঢাকা দিলেও তাদের রেখে যাওয়া দোসর ও অর্থ যোগানদাতারা গোপনে করছেন পৃষ্ঠপোষকতা।
বিএনপি নেতাদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। মূলত, শ্রমিক আন্দোলন ভিন্নক্ষাতে নিতে আড়াল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যাওয়া এই আওয়ামী দোসর ও অর্থ যোগানদাতা কারা-সেই প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
এরই মাঝে অন্তরালের ‘মাস্টারমাইন্ড’ তথা ‘নাটেরগুরু’ হিসেবে সমালোচনার কাঠগড়ায় উঠে এসেছে ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকায় অবস্থিত মেট্রো গার্মেন্টস ও পানাম গ্রুপের চেয়ারম্যান বাবু অমল পোদ্দারের নাম।
অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের প্রথম দিন তথা ২ নভেম্বর মেট্রো গ্রুপের মালিক বাবু অমল পোদ্দার সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শ ছাড়া হুট করেই তার বৃহত্তর কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করেন। এতে কারখানার প্রায় ৫ হাজারেরও অধিক শ্রমিক একত্রিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, সুযোগ পেয়ে বিপুল সংখ্যক এই শ্রমিকদের সাথে মিশে যায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ছদ্মবেশী কর্মীরা। ভিতর থেকে শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে শুরু করে তাণ্ডব। মারমুখী আচরণ সহ সড়ক অবরোধ করে টানা ৬ ঘন্টা ব্যাপী বিক্ষোভ চালিয়ে অচল করে তোলে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের মত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। এভাবেই শুরু হয় আন্দোলনের সূত্রপাত।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের অভিযোগ, এভাবেই পরিকল্পিত ভাবে আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মূখ্য ভূমিকা রাখে মেট্রো গ্রুপের মালিক অমল পোদ্দার।
এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক রুহুল আমিন শিকদার তার ফেসবুক আইডিতে মেট্রো গার্মেন্টস এর মালিক অমল পোদ্দারকে নাটেরগুরু আখ্যায়িত করে পোস্ট করেন। অমল পোদ্দার পরিকল্পিত ভাবে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করিয়েছেন বলে মন্তব্য করে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবিও তুলেছেন।
তবে গতকালের আন্দোলনে অবীর ফ্যাশনের মালিক তার ফ্যাক্টরীর শ্রমিকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ছুটি দিয়ে আন্দোলনে নামতে উস্কে দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন রুহুল আমিন শিকদার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেট্রো ও পানাম গ্রুপের মালিক অমল পোদ্দার আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ দোসর হিসেবে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জের বিতর্কিত ও পলাতক সাবেক এমপি শামীম ওসমানের সাথে তো বটেই, খোদ আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান তথা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথেও সরাসরি ঘনিষ্ঠতা রয়েছে অমল পোদ্দারের। ক্ষমতায় থাকাকালীন বিভিন্ন সেমিনারে শেখ হাসিনা নিজ হাতে তাকে সংবর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছিলেন। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন এই ব্যাক্তি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বাসিন্দা। আওয়ামী লীগের আমলে তিনি সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন অমল পোদ্দার আওয়ামী লীগের অন্যতম ডোনার তথা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিশেষ অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
এরই মাঝে গত ২ নভেম্বর নিজ কারখানার শ্রমিকদের পরিকল্পিত ভাবে ছুটি দিয়ে আন্দোলনে নামার পথ তৈরি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আড়াল থেকে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নেও ভূমিকা রাখছেন বলে চলছে সমালোচনা।
এদিকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে পানাম গ্রুপ ও মেট্রো নিটিং এন্ড ডাইং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল পোদ্দার বলেন, ‘আমি জেলা প্রশাসক সাহেবের কার্যালয়ে একটা মিটিংয়ে আছি। মিটিং শেষে কথা বলবো।’