ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিয়েভকে রাশিয়ার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গত রোববার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি দাবি করেন, ইউক্রেনকে নতি স্বীকারে রাজি করানোর জন্য ওয়াশিংটন থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যদিও তিনি সরাসরি বিশ্বাস করতে চান না যে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চাইছে, কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতি তাকে সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার পর এবারই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে এমন ইঙ্গিত দিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি। শান্তিচুক্তির আলোচনায় ক্রেমলিনকে উৎসাহিত করতে কেন বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জেলেনস্কির সমালোচনা করেন।
ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধের শক্তিকে খর্ব করতে পারে। তিনি আরও বলেন, স্বৈরশাসকদের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সহজাত অনুরাগ রয়েছে, যা ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তার মনোভাব থেকেই স্পষ্ট। বিপরীতে ট্রাম্পের পাল্টা অভিযোগ, জেলেনস্কি এই যুদ্ধ শেষ করতে ইচ্ছুক নন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও কমিয়ে দিতে পারে। গত রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প সংঘাতের আগ্রাসী পক্ষ রাশিয়ার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানান।
দুই নেতার মধ্যে এই বাগ্যুদ্ধ প্রকট আকার ধারণ করে গত ৯ অক্টোবর, যখন ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে জ্বালানি তেলের দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কিনবে। এছাড়া ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করার জন্য চাপ দিচ্ছেন। তার মতে, এসব হামলা বন্ধ হলে রাশিয়ার তেল বিশ্ববাজারে অবাধে ফিরতে পারবে। দুই নেতার মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হওয়ার মধ্যেই তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত সপ্তাহজুড়ে দুই নেতার মধ্যে নজিরবিহীন কঠোর ভাষায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে।
কিয়েভের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, সম্মুখসমরের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানও অনেকটা সংকুচিত হয়েছে, যার ফলে রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সম্পর্কে কিয়েভ আগে থেকে কোনো সতর্কবার্তা পাচ্ছে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ার পেছনে তাদের ব্যবস্থার কোনো সফটওয়্যার ত্রুটি থাকতে পারে। সম্মুখসারির সামরিক অভিযান পরিচালনায় এ নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ।
গত রোববার স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে কিয়েভে প্রথম দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় কোনো সতর্কবার্তা ছিল না বলে বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত নিশ্চিত করেছেন। ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলে রাশিয়া ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২৭০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে ২৪০টির বেশি ড্রোন ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা প্রতিরোধের হার গোপনীয়তার স্বার্থে প্রকাশ করেনি তারা। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে কয়টি ভূপাতিত করা হয়েছে, তা জানানো হয়নি।
প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি বর্তমানে কিয়েভের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার অভাব প্রকট।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে এসব অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে ওয়াশিংটন প্যাট্রিয়ট সরবরাহ করতে দেরি করছে বলে জেলেনস্কি জানান। প্রতিরোধী অস্ত্রের অভাবে এখন রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আসার সময় আগেকার মতো আকাশ সুরক্ষাব্যবস্থার পাল্টা আওয়াজ কম শোনা যাচ্ছে, বরং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিস্ফোরণের শব্দে শহর কেঁপে উঠছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে।
রোববার রাতের হামলার পর কিয়েভের কেন্দ্রস্থলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। হামলার কয়েক মুহূর্ত পরই একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ১৯৬২ সালের জনপ্রিয় একটি গীতিময় গান ভেসে আসে। যুদ্ধের ভয়াল পরিস্থিতির মধ্যেও এই গানটি এখন কিয়েভের সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জেলেনস্কি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ চলাকালীন নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা থাকলেও তিনি তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। যদিও রাশিয়ার ক্রমাগত অস্বীকৃতি এবং নাগরিকদের বিরোধিতার কারণে যুদ্ধকালীন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। এদিকে সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, আগামী মাসে চীনের শেনজেনে পুতিন, ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক হতে পারে, যা ইউক্রেনের ওপর নতুন কোনো নেতিবাচক সমঝোতা চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ইউক্রেনের জনগণকে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি টেলিভিশনের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে জেলেনস্কির বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুদ্ধ চলাকালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলে তিনি তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তার এ বক্তব্যে ইউক্রেনে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।