আজ সোমবার, ১৩ই মাঘ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধুর খুনি না.গঞ্জে দাফন, লাশ অপসারণের দাবি

সংবাদচর্চা রিপোর্ট:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকরের পর তার লাশ কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের হোসেনপুর এলাকায় দাফন করা হয়েছে।

মাজেদের শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে শনিবার দিনগত রাত ৩টার দিকে তার লাশ দাফন করা হয়।

স্থানীয় প্রশাসন, শম্ভুপুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ ও একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনির লাশ সোনারগাঁয়ে দাফন করার খবর সকালে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সোনারগাঁওয়ে মাজেদের লাশ দাফন করায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ ও লাশ অপসারণের দাবি জানান।

সোনারগাঁও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, উপজেলা আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ খুনি মাজেদের লাশ সোনারগাঁওয়ে দাফন করায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

অনেকে মাজেদের লাশ অপসারণ না করা হলে তা কবর থেকে তুলে মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন।

                                      বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি প্রসঙ্গে যা বললেন আইভী

শনিবার দিনগত রাত ১২টা ১ মিনিটে আবদুল মাজেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। পরে তার লাশ দাফন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। তার গ্রামের বাড়ি ভোলায় দাফনের কথা থাকলেও সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের প্রবল আপত্তির মুখে ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি ভোলার প্রশাসন।

শেষ পর্যন্ত শ্বশুরবাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে দাফনের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে বিকালে লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এমপি শাওন বলেন, খুনি মাজেদের লাশ ভোলাবাসী গ্রহণ করবে না।

মাজেদের লাশ প্রয়োজনে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিতে বলেন এমপি শাওন।

রোববার প্রথম প্রহরে (রাত ১২টা এক মিনিট) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে (৭২) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৪৪ বছর ৭ মাস ২৬ দিন পর খুনি মাজেদের ফাঁসি হয়। এতে শাহজাহানের নেতৃত্বে মনির ও সিরাজ জল্লাদ হিসেবে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মোট ৬ জনের সাজা কার্যকর হল। পলাতক আছে আরও ৫ খুনি। দণ্ড মাথায় নিয়ে এক খুনি বিদেশেই মারা গেছে। আদালত ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন।

শনিবার দুপুরের পর থেকে রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাজেদকে জানিয়ে দেয়া হয় তার সাজার বিষয়। কারা চিকিৎসক খুনি মাজেদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন।

কয়েকবারই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। রাতে মাজেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার স্ত্রী সালেহা বেগম, সালেহার বোন ও ভাইয়ের ছেলে। এ সময় তারা কারা প্রকোষ্ঠেই কিছু সময় কাটান। বেরিয়ে আসার সময় স্ত্রী সাহেলাকে চোখ মুছতে দেখা গেছে।

সন্ধ্যার পরপরই মাজেদকে রাতের খাবার খেতে দেয়া হয়। কারা মসজিদের ইমাম এসে তাকে তওবা পড়ান। এর আগে তাকে গোসল করানো হয়। সব কিছুই শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে সম্পন্ন করে মাজেদ। শেষ সময় সে নামাজ আদায় করে।

রাতে ধীর পদক্ষেপে মাজেদ ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। তবে কারাগারের সেল থেকে বের করার সময় তাকে কিছুটা ভীত দেখা যায় বলে জানিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। দুই দিক থেকে দু’জন জল্লাদ তাকে মঞ্চের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ফাঁসি কার্যকরের সময় ঢাকার জেলা প্রশাসক, এসপি, সিভিল সার্জন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, আইজি (প্রিজন্স), কারা চিকিৎসকসহ কারা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে তোলার পর জল্লাদদের একজন কালো রঙের জমটুপি দিয়ে তার মাথা ও মুখ ঢেকে দেয়। গলায় দড়ি পরিয়ে দেয় অপর জল্লাদ।

এরপর সিনিয়র জেল সুপার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাতে রুমাল নিয়ে দাঁড়ান। ঘড়ির কাঁটা নির্ধারিত সময় স্পর্শ করার পর তিনি হাতের রুমাল ফেলে দেন। রুমাল পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদ মঞ্চে হাতল ধরে টান দেয়। দু’ফাঁক হয়ে যায় প্লেট, ঝুলে পড়ে মাজেদের দেহ। কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে রাখার পর তার মরদেহ ফাঁসির মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনা হয়। চিকিৎসক তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

এরপর তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। মৃতদেহ রাখার জন্য আগেই কফিন এনে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে কফিনে ভরে পরিবারের সদস্যদের কাছে লাশ হস্তান্তর করেন কারা কর্তৃপক্ষ।

কে এই ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ : ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাটামারা গ্রামের মরহুম আলী মিয়া চৌধুরীর ছেলে ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ। ১৯৭৫ সালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকাণ্ডের সময় সে অন্য আসামিদের সঙ্গে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। হত্যাকাণ্ড শেষে সে বঙ্গবন্ধু হত্যার অপর আসামি মেজর শাহরিয়ারসহ অন্য সেনাসদস্যদের সঙ্গে রেডিও স্টেশনে দায়িত্ব পালন করে।

সে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী অফিসারদের সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের আদেশে বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া যায়। সেখানে ক্যুকৃত অফিসারদের সঙ্গে তিন মাস অবস্থান করে। এরপর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান তাকে সেনেগাল দূতাবাসে বদলির আদেশ দেন।

১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান সরকার ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে বিআইডব্লিউটিসিতে চাকরি দেন এবং উপসচিব পদে যোগদানের সুবিধার্থে সেনাবাহিনী চাকরি থেকে সে অবসর নেয়। পরে তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ শুরু করলে সে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে আত্মগোপন।