সংবাদচর্চা রিপোর্ট:
অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলার রাজনীতি। উত্তর মেরু আর দক্ষিন মেরু করনের রাজনীতি এখন ক্রমশই মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে। দল একটিই তবে দ্বিখন্ডিত দুই মেরুর পাল্টা-পাল্টি অভিযোগের খেলায় বিনষ্ট হচ্ছে নগরীর স্বাভাবিক জীবন মান আর নষ্ট হচ্ছে স্বাভাবিক রাজনীতির আবহাওয়া। তবে অনেকেই মনে করেন যেহেতু নারায়ণগঞ্জ প্রাচীন একটি জনপদের মধ্য অন্যতম, সেহেতু এই জেলায় প্রবীন রাজনীতিবিদদের অবস্থানও চোখে পড়ার মতো। কাঙ্খিত কিংবা অনাকাঙ্খিত ভাবে জেলার প্রবীন রাজনীতিবিদরা দুই মেরুর পাল্টা-পাল্টি অভিযোগের খেলায় দর্শক হিসেবে যে যার মতো মুজা লটুছেন বলে অনেকেই মনে করেন।
২০১১ সালের সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দুই মেরুর দুই প্রভাবশালীর দ্বন্দ্ব অকপটে প্রকাশ্যে চলে আসে। একদিকে বর্তমান মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তার সমর্থক গোষ্ঠি অপর দিকে বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার বলয়ের নেতাকর্মী। মেয়র আইভীর ক্ষেত্রে দৃশ্যপট একটু ভিন্ন হলেও সাংসদ শামীম ওসমান ও তার বলয়ের নেতাকর্মীদের হুঙ্কার আর হুমকিই যেন নারায়ণগঞ্জের অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে অনেক গুন। বিগত সময় এবং বর্তমানের অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা গেছে যে, মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বরাবরের মতো শামীম ওসমান কিংবা শামীম ওসমান বলয়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ কিংবা অনিয়মের বিষয়ে প্রকাশ করেছেন সেই সকল বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপাত্য উপস্থাপন করেছেন কিংবা তার স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। অপর দিকে মেয়র আইভী শামীম ওসমান তার সমর্থিত নেতার্কীদের বিরুদ্ধে যখনি কোন অভিযোগ করেছে ঠিক তখনই এই মেরুর নেতাকর্মীরা মেয়র আইভীর অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো যুক্তি উপস্থাপিত না করেই বরাবরের হুঙ্কার কিংবা পাল্টা অভিযোগ করেছে যাচ্ছেন।
তবে, হঠাৎ করেই ৮ জুন ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্য সচিব ও প্রবীণ সাংবাদিক হালিম আজাদের একটি বক্তব্য দুই মেরুর ছাইচাপা অনলে হাওয়া দিয়ে উস্কে দেয়। হালিম আজাদ সেদিন তার বক্তব্যে ত্বকী হত্যায় সাংসদ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান এবং ভাতিজা আজমেরি ওসমানের গ্রেফতার দাবি করেন। তার এই বক্তব্যেও পরই তীব্রভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে ওসমান পরিবার অনুসারি ব্যক্তিরা। এরমধ্যে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হালিম আজাদের গ্রেফতার দাবি করে, জিল্লুর রহমান লিটন ওই প্রবীণ সাংবাদিককে অসুস্থ দাবি করে তার ডোপ টেস্ট করানোর দাবি তুলেন। সাংসদ পুত্র অয়ন ওসমান এ ঘটনায় ফেসবুকে পোস্টে তার অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।এছাড়াও গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মো. বাদল হালিম আজাদকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান করেছিলেন।
এই উত্তেজনার পারদ আরও বেশি করে ছড়িয়ে দেন মেয়র আইভী আলীগঞ্জ মাঠে ১৫ জুন বক্তব্য রাখতে গিয়ে। তিনি সেখানে তার বক্তব্যে সাংসদ শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে ৪ একর জমি দখলের অভিযোগ তুলেন। আইভী বলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের ওসমানী স্টেডিয়াম দখল করে আপনার বাবার নাম দিয়েছেন কেন, কি কারনে? সাবেক পৌরসভার ৯ একর জমি দিয়েছেলো এই ওসমানী স্টেডিয়ামের জন্য। সেখান থেকে আপনি ৪ একর জমি দখল করে নিয়েছেন। সেই দখল করা জমিতে আপনি আপনার বাবার নাম দিয়েছেন। কেন দখল করেছেন? দখলের করার স্বভাবটা আপনি বন্ধ করুন।’
মেয়রের ঐ বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পরই বেশ ভালো ভাবেই চটেন শামীম ওসমানের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত এবং মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম। শামীম ওসমানকে ‘দখলবাজ’ তিনি পাল্টা মেয়র আইভীসহ তার পিতা, পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনদেরকে দখলবাজ বলে মন্তব্য করেন। এছাড়াও শাহ নিজাম আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি আপনার বিশ্বস্ত লোক দিয়ে সিটি করপোরেশন এর সকল টেন্ডার নিজের দখলে রেখেছেন। আপনার পিতা জিওস পুকুর, বর্তমান আপনার বাড়িসহ বহু হিন্দু সম্পত্তি দখল করেছেন। কাউকে খুশি করতে একজন সন্মানিত সাংসদকে নিয়ে কটুক্তি করা শোভনীয় না।’
শাহ নিজাম সহ শামীমপন্থী অন্য সকল নেতাকর্মীদের আল্টিমেটাম আর হুঙ্কারের বিষয়টি ভালো ভাবে গ্রহণ করতে পারেনি নারায়ণগঞ্জের বোদ্ধামহল। বোদ্ধামহলের মতে মেয়র আইভী যখনি কোন অভিযোগ করেছেন তখন শামীম ওসমান কিংবা তার বলয়ের নেতাকর্মীরা মেয়র আইভীর অভিযোগগুলোকে ভুল প্রমান করতে পারেন নি। পারেননি শামীম ওসমানের পক্ষে কোন প্রকার যুক্তি কিংবা তথ্য উপাত্য উপস্থান করতে। শাহ্ নিজাম, চন্দন শীল, অয়ন ওসমান সর্বদাই মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ছোট করতে বিভিন্ন অপ্রতিকর পন্থা অবলম্বন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অনেক বাজে মন্তব্য করেছেন। তাদের এহেন সকল কর্মকান্ডের বিপরীতে মেয়র আইভী কোন প্রকার প্রতিবাদ কিংবা এর কোন প্রতিকারও চাননি। মেয়র আইভী বলেননি তাদের ক্ষমা চইতে এবং দেননি কোন আল্টিমেটাম। বোদ্ধা মহলের মতে এইখানেই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে মেয়র আইভী। যেখানে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান সহ ওসমান বলয়ের নেতৃবৃন্দরা সন্ত্রাসী কায়দায় হুঙ্কার গর্জন দিচ্ছেন সেখানে মেয়র আইভী ভদ্রতা অবলম্বন করে নিশ্চুপ থেকেছেন।
নগরীর বোদ্ধামহল তাঁদের অভিমত প্রকাশ করে আরো বলেন, শামীম ওসমান সহ তার নেতাকর্মীদের উচিত হবে যথাযথ নিয়ম অনুসরন করে মেয়র আইভী, হালীম আজাদ সহ ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির অভিযোগের বিষয়টি ভুল প্রমাণ করার। তারা সহ অন্য যারা ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলছে সেই বিষয়গুলোকে মিথ্যা প্রমান করে মেয়র আইভী সহ তার অনুসারীদের ভুল প্রমান করে তাদের উপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।
সর্বশেষ ১৬ জুন মেয়র আইভীর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি চন্দন শীল। ২০০১ সালে চাষাড়া শহীদ মিনারের পাশে আওয়ামী লীগের অফিসে বোমা হামলার ঘটনায় নিহত ২০ জনের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ময়লা আবর্জনার স্তুপ হয়ে থাকায় তিনি ওই আল্টিমেটাম দেন। অন্যথায় মেয়রের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন। চন্দনশীলের বেধে দেয়া আল্টিমেটারে আগেই নাসিক স্মৃতিস্তম্ভ থেকে ময়লার ডাস্টবিন সরিয়ে নিয়েছে। জানা গেছে ওখানে ডাস্টবিন স্থাপন করেছিলো বিডি ক্লিনিক নাসিক নয়।
এদিকে মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি চন্দন শীলের ২৪ ঘন্টার সময় বেধে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নগরজুড়ে তৈরী হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সচেতন মহলের মতে এর আগেও একটি ঘটনায় স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের একজন সদস্য নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন রশীদকে একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে ছিলেন ক্ষমা চাওয়ার জন্য। সেই সময় ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম একাধিক ২৪ ঘন্টায় রূপান্তিরত হলেও স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সেই সদস্য ছিলেন অনেকটা নিশ্চুপ। তাই চন্দন শীলের এই আল্টিমেটাম অসুস্থ্য সাবকের হুঙ্কার বলে মনে করছেন অনেকেই।
চন্দন শীল বরাবরই একজন দেশ প্রেমিক মানুষ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারনে আজ তাকে পুঙ্গত্ব বরণ করতে হয়েছে।
সর্বশেষ নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে যে সকল শিক্ষার্থী নারায়ণগঞ্জের রাজপথ দখল করে রেখেছিলেন সেই সকল শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলেছিলেন তিনি।
চলমান এ সকল ঘটনার প্রেক্ষিতে নগরীর একাধিক রাজনৈতিক বোদ্ধামহল আশা ব্যক্ত করে বলেন, এই দুই মেরুর নেতাকর্মীরা অবশ্যই সংযম হবেন যে সকল প্রবীনরা চেয়ারে বসে খেলা দেখছেন তারা তাদের বিনোদনের মোহ ভেঙ্গে জটিল এই সমস্যার সমাধান করবেন।

