আজ , ,

হাম মোকাবিলায় ৬ মাস থেকে ৯ বছর বয়সীদের দ্রুত

দেশে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে টিকা না পাওয়া ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের এই দল জানিয়েছে, টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের ঘাটতির কারণে হামের এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিশেষ করে ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অসংখ্য শিশুর টিকার বাইরে থেকে যাওয়া এবং ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সুপারিশের মধ্যে আরও রয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে বাদ পড়া শিশু ও সংক্রমণ বেশি থাকা জেলাগুলোতে এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দিতে হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ নজরদারি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল এসব সুপারিশ করেছে। গত বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া দেশের জনঘনত্ব ও প্রাদুর্ভাবে অপর্যাপ্ত সাড়ার কারণে প্রাদুর্ভাব এ পর্যায়ে এসেছে। এ বছর মার্চে শুরু হয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব, শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া হাম–রুবেলা টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। তবে হাম মোকাবিলায় কমিউনিটির সম্পৃক্ততার কথা সুপারিশে নেই, মনে হয় কিছুটা গুরুত্ব কম পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের অন্তর্ভুক্ত না করা এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যথাযথ সাড়া না দেওয়ার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব এখনো নিয়ন্ত্রণে না আসায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ১ হাজার ৩১৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ জন রোগী হাসপাতালে এসেছে এবং হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে ১ হাজার ১৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছে।

মূল্যায়ন দলের সুপারিশ অনুযায়ী, যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি এবং টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি, সেখানে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রাদুর্ভাব চলাকালীন সুরক্ষার জন্য ছয় মাস বয়স থেকেই শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের আলাদা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ছয় মাসের কাছাকাছি বয়সী শিশুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক করে রাখতে হবে।

রোগীর সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত হালনাগাদ নির্দেশনা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সন্দেহভাজন সব রোগীর তথ্য (নাম, ঠিকানা, বয়স ও লিঙ্গ) নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা এবং প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ চর্চা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুদের টিকার কার্ড যাচাই-বাছাই করা এবং ২০২৯ বা ২০৩০ সালের পরবর্তী ক্যাম্পেইনের জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়েছে দলটি। সরকার ধারণা করেছিল, টিকার মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন জানান, বিশেষজ্ঞ দলের সুপারিশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের বয়সসীমা বাড়ানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা সময়োপযোগী। তবে হাম নিয়ন্ত্রণে কেবল টিকার ওপর নির্ভর না করে কমিউনিটির সম্পৃক্ততা বাড়ানো জরুরি। তার মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক প্রণোদনা ও ওষুধ নিশ্চিত না করলে রোগীদের হাসপাতালে আনা কঠিন হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ প্রায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা না দিলে, ওষুধের সহায়তা না দিলে তারা হাসপাতালে আসবে কেন।

তিনি আরও বলেন, সংক্রমণের শিকার হওয়া ২১ দিনের নবজাতক কিংবা ১৫ বছর বয়সী টিকা না নেওয়া মায়ের মতো ঘটনাগুলো টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। একই সাথে ডেঙ্গু ও হামে যুগপৎ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এসব প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করতে গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন। সবশেষে বিশেষজ্ঞ দল বলেছে, টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও মাঠপর্যায়ের ত্রুটিগুলো খতিয়ে দেখতে গবেষণা করতে হবে। ‘হাম-ডেঙ্গু দুটোতেই আক্রান্ত, ডাক্তার দেখে বলছে পজিশন খারাপ’।

আরও পড়ুন: , , , ,