আজ বুধবার, ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সোনারগাঁ আওয়ামী লীগে ছন্দপতন

সংবাদচর্চা রিপোর্ট

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের অবিচ্ছেদ্দ অংশ বলা হয়ে থাকে সাজেদ আলী মোক্তার ও হাসনাত পরিবারকে। সাজেদ আলী মোক্তার ছিলেন জাতির জনকের ঘনিষ্ঠসহচর এবং আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকালিন সদস্য। তবে, বর্তমানে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে এই দুটি পরিবারকেই নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সোনারগাঁয়ে সাজেদ আলী মোক্তার ও হাসনাত পরিবারকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা মানে এই উপজেলায় আওয়ামী লীগকেই দুর্বল করে দেওয়া, বলছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা। তারা বলছেন, এক বা দুই বছর ধরে নয়, কয়েক যুগ ধরেই সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করে রেখেছে সাজেদ আলী মোক্তার ও হাসনাত পরিবার। তারা কখনই জাতির জনকের আদর্শচ্যুত হয়নি। এই পরিবার থেকে কেউ কখনই অন্যকোনো দলেও যায়নি। সুখে দুঃখে তারাই ছিলেন সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের কান্ডারি।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, সাজেদ আলী মোক্তার ১৯৫৪ সালে সোনারগাঁ থেকে যুক্তফ্রন্টের হয়ে নির্বাচিন করে বিজয়ী হন। তিনি ছিলেন সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রথম সভাপতি। ১৯৭০ এর নির্বাচনে গণপরিষদের সদস্য ছিলেন সাজেদ আলী মোক্তার। ১৯৭৩ এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন একই আসন থেকে।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি সাজেদ আলী মোক্তারের পরিবার আওয়ামী লীগের সঙ্গেই রয়েছেন। সোনারগাঁয়ে তারা পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগ পরিবার। সাজেদ আলী মোক্তারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগে বিশেষ অবদান রেখে গেছে হাসনাত। তথা সাজেদ আলী মোক্তারের পর তার ভাতিজা মোবারক হোসেন, আবুল হাসনাত, মোশারফ হোসেন এবং সাজেদ আলী মোক্তারের ছেলে আরিফ মাসুদ বাবু স্থানীয় আওয়ামী লীগের হাল ধরেন।
সূত্র জানায়, সাজেদ আলী মোক্তারের ভাতিজা মোবারক হোসেন দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন সোনারগাঁ আসন থেকে। জাতীয় পার্টির আমলে নারায়ণগঞ্জের অন্য চারটি আসন আওয়ামী লীগ হারালেও একমাত্র মোবারক হোসেনই সোনারগাঁয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মোবারক হোসেন ছাড়াও আবুল হাসনাতের ছেলে আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক।

সাজেদ আলী মোক্তারের আরেক ভাতিজা মোশারফ হোসেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনিও এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। সাজেদ আলী মোক্তারের ছেলে আরিফ মাসুদ বাবু মোগড়াপাড়া ইউনিয়নে ২০১১ এবং ২০১৬ সালে দু’বার দলীয় সমর্থনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। আগামী ১৫ জুন নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন তিনি। এই ক্ষোভে স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন বাবু।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, আরিফ মাসুদ বাবু মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন। নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে বিলুপ্ত হওয়া জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোহাগ রনিকে। এই বিষয়টি সাজেদ আলী মোক্তার ও হাসনাত পরিবারের জন্য অসম্মান, অপমানের। কেননা, এই পরিবার দুটি না থাকলে সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুগ যুগ ধরে নানা ঝড়-জঞ্জাতেও তারা সামনে থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। সুতরাং এমন একটি পরিবারকে এই সময়ে এসে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা মানে আগামীতে আওয়ামী লীগের ক্ষতি করা।

স্থানীয় নেতারা বলছেন, জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়ার কারণে সোনারগাঁয়ে গত দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের এমপি নেই। ফলশ্রুতিতে এখানে জাতীয় পার্টির প্রভাব স্বাভাবিক অর্থেই বেশি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে, সোনারগাঁয়ের রাজনীতি আগে এখানকার মানুষজন নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে একটি বিশেষ পরিবার সোনারগাঁয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। ওই পরিবারের আজ্ঞাবহ যারা, যারা ওই পরিবারের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, তারাই এখানে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। তাদের কারণে অনেক হাইব্রিডরা এখন অত্যন্ত দাপুটে। তাদের দাপটে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বড় রকমের ধস নেমে আসতে পারে। কেননা, সাজেদ আলী মোক্তার ও হাসনাত পরিবার ছাড়া এখানে আওয়ামী লীগ করার মত কোনো লোকই ছিল না। এই পরিবারকে ঘিরেই এখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির উত্থান হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিবারকে পাশ কাটিয়ে হাইব্রিডদেরকে যদি সামনে নিয়ে আসা হয় তাহলে আগামীতে এই দলকেই চরম খেসারত দিতে হতে পারে। বিষয়গুলো দলীয় প্রধানের নজরে আসা দরকার বলে তারা মনে করেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মাহফুজুর রহমান কালাম বলেন, “ইতিহাসের করুন পরিনতির দিকে যাচ্ছি আমরা। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে এই পরিবার দুটিকে উৎখাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে সর্বহারা করা হলো। দলের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে সোনারগাঁ থেকে আওয়ামী লীগের পতনের পথকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাবে বলে মনে করছি।”

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাজেদ আলী মোক্তারের পরিবারের মত আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন মাহফুজুর রহমান। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া এই পরিবার থেকে বহু সদস্য আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই পরিবার থেকে একজন লোকও আওয়ামী লীগের বাইরে গিয়ে অন্য দলের রাজনীতি করেনি। অন্য দলে গিয়ে এমপি মন্ত্রী হওয়ার সুবিধাও গ্রহণ করেনি। অথচ সেই পরিবারকে আওয়ামী লীগের আমলেই সব কিছু থেকে বঞ্চিত করতে উঠে পরে লেগেছে একটি মহল। যা অত্যন্ত দুঃখজনক আমাদের জন্য।”

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ