আজ শুক্রবার, ১৩ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

মুখরিত বাণিজ্য মেলা

এম.এ মোমেন

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্রেতা দর্শনার্থীরেদ পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মেলার প্রথম দিকে কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় আসে। পরে গত বৃহস্পতিবার ও গতকাল শুক্রবার বিশ্ব ইস্তেমাকে কেন্দ্র করে ঢাকা-কুড়িল-কাঞ্চন সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঢাকা বাইপাস সড়কেও ধীর গতিতে যানবাহন চলাচল করে। তাতে ভোগান্তিতে পড়েন পরিবহনের যাত্রী, মেলার ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা। এ ভোগান্তি অতিক্রম করে গতকাল শুক্রবারও ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় আসেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেলাপ্রাঙ্গণ দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। স্টল ও প্যাভিলিয়নে ছিল উপচে পড়া ভিড়। বেলা ১১টা থেকে ক্রেতা দর্শনার্থীরা আসতে শুরু করে। জুম্মার নামাযের পর মেলায় মানুষের ঢল নামে। সন্ধ্যা পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, মেলার দ্বিতীয় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলায় মানুষের ঢল নামে। নারী ও শিশুদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। কেউ কেউ অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করে রাখেন। কেউবা মাসিক কিংবা সিজনাল টিকিট ক্রয় করেন। স্পেশাল ও ভিআইপি টিকিটেও দর্শনার্থীরা মেলায় প্রবেশ করেন। বিকেল ৫ টায় মেলার স্টল ও প্যাভিলিয়নে উপচে পড়া ভিড় জমে। পণ্য বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। ভালো মানের পণ্য পেয়ে ক্রেতারা খুশি। তাতে লাভবান হয়ে বিক্রেতারাও আনন্দিত। তবে সড়কে যানজট না থাকলে ক্রেতা দর্শনার্থীদের আগমন আরও বেশি হতো বলে জানিয়েছেন কিউ এন্ড কিউ ট্রেডিং লিমিটেডের প্রধান বিক্রয় প্রতিনিধি মোঃ হায়াতুর রহমান।
ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা স্টলগুলোতে তাদের পছন্দের পণ্য ঘুরে ঘুরে দেখেন ও কেনাকাটা করেন। বেশি ভিড় ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য, শীতবস্ত্র, কসমেটিকস, তৈজসপত্র, প্রসাধনী, কাপড়, শো-পিস, কুটির শিল্প, কার্পেট, অলংকার ও ইলেক্ট্রনিকস পণ্যের স্টলে। আইসক্রিমের স্টলগুলোতেও ছিলে ক্রেতাদের আনাগোনা। তুর্কিজ স্টলসহ বিদেশিদের স্টলে দৃষ্টি ছিল সবার। বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। গতকাল শুক্রবার দর্শনার্থীদের পদচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুরের পর থেকে বাড়তে থাকে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের সমাগম। স্টলগুলোতে নারীদের ভিড় ছিল বেশি। তরুণীদের অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে মেলায় এসেছেন। পছন্দের জিনিস কিনেছেন তাঁরা। প্লাস্টিক পণ্য, ক্রোকারিজ, ইমিটেশনের গয়না, শাড়ি, থ্রি-পিস, কসমেটিকসের স্টলগুলোতে নারী ক্রেতাদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। মূল্য ছাড়, ফ্রি হোম ডেলিভারি সার্ভিসসহ বিভিন্ন অফার থাকায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। মেলায় শিশুদের জন্য রয়েছে নজরকারা ডিজাইনের পোশাক, জুতা ও খেলনা। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও দল বেঁধে মেলায় আসেন। নানা শ্রেণির ও নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে উঠে মেলা প্রাঙ্গন। ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে স্টলের দায়িত্বরতদের হিমসিম খেতে হয়।
মেলায় প্রবেশ টিকিটের ইজারাদার ও রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ মোঃ ছালাউদ্দিন ভ্ইুঁয়া বলেন, কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা আর যানজট উপেক্ষা করে ক্রেতা দর্শনার্থীরা প্রতিদিন মেলায় আসছে। গত ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মেলাার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিন বিকালে টিকিট কেটে ৩ হাজার ২১৭ জন দর্শনার্থী মেলায় প্রবেশ করেছেন। ২ জানুয়ারি ৭ হাজার ৪৮১ জন, ৩ জানুয়ারি ৯ হাজার ৭১২ জন, ৪ জানুয়ারি ১০ হাজার ২৬ জন, ৫ জানুয়ারি ১৫ হাজার জন, ৬ জানুয়ারি ৬৫ হাজার জন, ৭ জানুয়ারি ৫৭ হাজার ৮৬৯ জন, ৮ জানুয়ারি ১৬ হাজার ৭৩২ জন, ৯ জানুয়ারি ১৭ হাজার ৮৭২জন, ১০ জানুয়ারি ২১ হাজার ৩২৪ জন, ১১ জানুয়ারি ২২ হাজার ৭১০ জন, ১২ জানুয়ারি ১৯ হাজার ১২৯ জন, ১৩ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ৫০ হাজার ৮৪৩ জন ক্রেতা ও দর্শনার্থী টিকিট কেটে মেলায় প্রবেশ করেছেন। এছাড়া অনলাইন, সিজনাল মাসিক টিকিট, স্পেশাল ও ভিআইপি টিকিট কেটে আরো অন্তত ১০ হাজার জন দর্শনার্থী মেলায় প্রবেশ করেছেন। তবে প্রতাশ্যা অনুযায়ী টিকিট এখনও বিক্রি হয়নি। নানা প্রতিকূলতায় মেলার আয়োজকদের উৎসাহ উদ্দীপনা কমছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়বেন।
রূপগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ মশিউর রহমান তারেক বলেন, ক্রেতা দর্শনার্থীদের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও ভিড় এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি রূপগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তিন শতাধিক নেতাকর্মী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়মনীতি, নিরাপত্তা আর শৃঙ্খলা বজায় রাখতেও তারা কাজ করবে।
ঢাকার ডেমরার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহিয়া জাহান এশা স্বপরিবারে মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, শিশু মেলা ও বিদেশিদের বাতিঘর স্টল দর্শক নন্দিত হয়েছে। মেলার পরিসর গতবারের চেয়ে ভালো হওয়ায় দর্শনার্থীদের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কসমেটিকস, ইমিটেশনের গহনা, শালসহ পণ্যের দাম বেশি। তবে মান সম্মত হওয়ায় ক্রয় করেছি। মেলায় এসে ভালো লাগছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে স্বপরিবারে আসা গৃহবধূ আয়েশা বেগম বলেন, এক ঘণ্টার পথ যানজটের কারণে চার ঘণ্টায় মেলায় এসেছি। যানজটে পড়ে গাড়িতেই মেলার আনন্দ শেষ হয়ে গেছে। ছেলে মেয়েরা ক্লান্ত হয়ে মেলায় প্রবেশ করেছে। যানজট নিরসন করতে না পারলে মেলার ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হবেন।
জাপান প্রবাসী নারায়ণগঞ্জের সোনাবো এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান নিশা বলেন, বাণিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে জাপান থেকে বাড়িতে এসেছি। আগামী সপ্তাহে জাপান ফিরে যাবো। কিন্তু কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশা আর যানজটের ভোগান্তিতে পড়ে মেলার আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি। স্টল ও প্যাভিলিয়ন নির্মাণ কাজ মেলা বসার আগেই সম্পন্ন করতে হবে। যানজট নিরসনে প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রাফিক নিয়োগ করতে হবে। মেলার আশপাশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে হবে। ধুলাবালুতে নিয়মিত পানি দিতে হবে। মেলাকে ক্রেতা ও দর্শকবান্ধব করে তুলতে হবে। তবেই মেলার আয়োজন সার্থক হবে।
ড্রেস লাইনের বিক্রয় প্রতিনিধি সারোয়ার জামান বলেন, মেলার ব্যবসায়ীদের দুর্ভাগ্য। উদ্বোধনের পর থেকে কয়েকদিন কেটে যায় কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশায়। এখন আবার বিশ্ব ইস্তেমাকে কেন্দ্র করে যানজট। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও নানা প্রতিকূলতায় আমাদের সময় পার হচ্ছে। এ প্রতিকূলতা কাটতে মেলার সময় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অন্যথায় ব্যবসায়ীরা অর্থ সংকটে পড়বে। অনেকেই পুঁজি হারাবেন।
আলয় এ্যালুমিনিয়াম ফার্নিচার শো-রুম ইনচার্জ মোঃ সাফিন পাটোয়ারী বলেন, এবার যখনই মেলা জমজমাট হয়ে উঠবে, ঠিক তখনই একটা না একটা প্রতিকূলতা নেমে আসে।
বেক্সি ফেব্রিকসের বিক্রয় প্রতিনিধি আবু সুফিয়ান বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাণিজ্য মেলা জমে উঠেছে। ক্রেতা দর্শনার্থীদের আগমন বাড়ছে। দেদারসে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। আমরাও আর্থিক লাভের আশা করছি।
দিল্লী এ্যালুমিনিয়ামের বিক্রয় প্রতিনিধি দিপালী রাণী সাহা বলেন, কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা আর যানজটেও মেলার ক্রেতা দর্শনার্থীদের থামিয়ে রাখতে পারেনি। শত বাধা অতিক্রম করেও তাঁরা মেলায় আসছেন। ঘুরে ফিরে দেখছেন। পণ্য ক্রয় করছেন। ব্যবসায়ীরাও লাভের মুখ দেখছেন।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপবি) সচিব ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও ক্রেতা দর্শনার্থীরা মেলায় আসছেন। এখনকার যানজট ক্ষণস্থায়ী। ইস্তেমা শেষ হলেই সড়কের যানজট নিরসন হয়ে যাবে। যানজট নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ