১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, বিকাল ৪:০৪

বেলা ১২টায় বন্ধ ক্লিনিক

সাবিত আল হাসানঃ

সুযোগ সুবিধার দিকে ভালো অবস্থানে রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরতরা। বেতন ভাতাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয়। সরকার এ ক্লিনিকগুলোকে সাধারণ মানুষের দোড়গোড়ায় সেবা পৌছে দিতে নির্দেশ দিলেও তারা তা মানছে না। বরং সেবাগ্রহীতাকে ধমক দিয়ে কাবু করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

কৃষক মকবুল আলমের (৫৮) বাস চতুর্দিক নদী বেষ্টিত একটি চরে। তবে তিনি একা নন, এখানে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে যাদের অধিকাংশেরই পেশা কৃষি ও জেলে। বিপুল এই জনগোষ্টির স্বাস্থ্যসেবা বরাবরই রয়ে গেছে উপেক্ষিত। সরকার থেকে এই সমস্যা উত্তরণে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহন ও স্থানীয়দের সহযোগীতা নেবার পরেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাননি এই জনপদের বাসিন্দারা।

নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার পশ্চিমে অবস্থিত এই চরে রয়েছে ২টি ইউনিয়ন বক্তাবলী ও আলীরটেক। এর সাথে যুক্ত রয়েছে মুন্সিগঞ্জ জেলার বালুচর ইউনিয়ন। নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলা শহরের কাছাকাছি এলাকা হওয়া সত্বেও বরারই স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ তোলেন স্থানীয়রা।

বিশেষ করে বক্তাবলী ও আলীরটেক ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার পরিকল্পনা কল্যান কেন্দ্র, হাসপাতাল ইত্যাদি স্থাপন করা হলেও তার কোনটিতেই পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। অথচ এসকল স্বাস্থ্য সেবা পেতে স্থানীয় বাসিন্দারাই তাদের জায়গা জমি দান করে এসেছেন অকাতরে।

মকবুল আলম বলেন, আমাগো যেই আয় রোজগার তাতে শহরে গিয়া ডাক্তার দেখাইয়া পোষায় না। ক্লিনিক থেকে ৫/১০টাকার ঔষধ দিয়াই আমাগো চিকিৎসা চলে। বেশী কষ্ট অইলে ধার দেনা কইরা ডাক্তার দেখাইতে হয়। কিন্তু এই ক্লিনিকেও ঠিকমত ঔষধ দেয় না। মন চাইলে ডাক্তার (ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী) আহে, মন চাইলে আহেনা। এমনেই চলে আমাগো অসুখ বিসুখের চিকিৎসা।

জানা যায়, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মাহে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার সারাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে। প্রতিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাবেন অন্তত ছয় হাজার মানুষ। ক্লিনিকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করার কথা ছিল। কিন্তু অদক্ষ জনবলের হাতে দায়িত্ব অর্পন ও নিয়মিত তদারকির অভাবে এর মূল উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না।

সরজমিনে নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে এসকল অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্লিনিকগুলো বেলা ১২টার পূর্বেই বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এসকল ক্লিনিক সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা রয়েছে।

বক্তাবলীর ৩ নং ওয়ার্ডের লালমিয়ার চরে অবস্থিত চর বয়রাগাদী কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ পাওয়া যায় বেলা সাড়ে ১১টায়। সরকারি ছুটি না থাকা সত্বেও এদিন ক্লিনিক খুলেন নি কর্তব্যরত চিকিৎসক। ধুলোয় ধূসরিত টেবিলে পড়ে রয়েছে একটি সিরিঞ্জের খালি প্যাকেট। যেন কতদিন স্পর্শ পরেনি ক্লিনিকটিতে। অথচ নিয়মিত সেবা পাবেন এই আশ্বাসে জমিটি দান করেছিলেন হাজী কালাই চান, আলী আজগর ও সুলতান আহমেদ। যাদের নাম এখনও জমিদাতা ফলকে উল্লেখ্যিত রয়েছে।

একই অবস্থা ইউনিয়নের চরপ্রসন্ন নগর কমিউনিটি ক্লিনিকের। বেলা ১২টার সময়েই পাওয়া যায় ক্লিনিকের তালাবদ্ধ অবস্থা। এই ক্লিনিক স্থাপনে জমি দিয়েছেন জাকির হোসেন। ভেতরে তাকাতেই চোখে পড়ে মোটা হরফে লেখা লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নিন, দুই দিনের বেশী ঔষধ দেয়া হয় না, ঔষধ থাকা সাপেক্ষে সবাই ঔষধ পাবে। আদেশক্রমে কতৃপক্ষ! এখানে চিকিৎসা সেবা দেন ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী চিকিৎসক এম.আওলাদ হোসেন শান্ত। এখানে কতৃপক্ষ বলতে তিনিই সর্বেসর্বা। কিন্তু লেখাটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ঔষধের মহা সংকট চলছে কমিউনিটি ক্লিনিকে।

নাম গোপন রাখার শর্তে এক কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শক বলেন, যেই পরিমান ঔষধ সরকারি ভাবে বরাদ্ধ দেয়া হয় প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে তা ২ বছর টানা ৪০ জনের মাঝে বিতরন করলেও শেষ হবেনা। এছাড়া এই প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী সরাসরি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এখানকার কর্মকর্তাদের বেতন কখনও বিলম্ব বা আটকে থাকেনা। সুযোগ সুবিধার দিক থেকেও তারা সবচেয়ে উপরে।

ক্লিনিকের আশেপাশের বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, যেই ডাক্তার আসে সে ঠিকমত ঔষধ দেয়না। নিয়মিত আসেনা ক্লিনিকে। সকাল ১১টায় আসলে ১২টার আগেই চলে যায়। অসুস্থ মহিলাদের সাথে খারাপ আচরণ করে। বাধ্য হয়ে অনেকেই এইখানে যেতে চায় না।

ইউনিয়নের গোপাল নগর এলাকায় অবস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ পাওয়া যায় বেলা সাড়ে ১২টায়। স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন সংস্কার কাজের জন্য বন্ধ ছিল চিকিৎসা সেবা। এখন করোনার দোহাই দিয়ে ক্লিনিক খুলেননা স্বাস্থ্য সহকারী। কবে নাগাদ শেষ খোলা পেয়েছিলো এই ক্লিনিক তাও জানেন না আশেপাশের দোকানিরা।

এ ব্যাপারে কথা হয় চরপ্রসন্ন নগর ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী আওলাদ হোসেন শান্ত’র সাথে, তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত থাকি। কিন্তু তার অফিস বন্ধ পাবার কথা অবগত করলে তিনি বলেন আমি মাঝে বেতন আনতে যাই, ঔষধ আনতে যাই সেজন্য বন্ধ থাকতে পারে। তাছাড়া আমার একার সব কাজ করতে হয়। এসব কারনে একটু সমস্যা হতে পারে।

একই বিষয়ে মুঠোফোনে বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হয় গোপাল নগর কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী মোহসেনা আক্তারের সরকারি নাম্বারে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

বন্ধ থাকা ক্লিনিকগুলোর বিষয়ে কথা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন আমরা নিয়মিত ক্লিনিকগুলো তদারকি করার চেষ্টা করি। কিছুদিন পূর্বেও কয়েকটি ক্লিনিক বন্ধ পাওয়ায় আমরা গোপাল নগর ও মধ্যনগর ক্লিনিকে কর্তব্যরত সহকারীকে শোকজ করেছি। প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ