আজ বুধবার, ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বিহারে বিজেপি জোট সরকার পতন

অনলাইন ডেস্ক:

ভারতের বিহার রাজ্যে পতন ঘটল বিজেপি–জেডিইউ জোট সরকারের। ৯ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল চারটায় মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল ফাগু চৌহানের হাতে তাঁর পদত্যাগপত্র তুলে দেন। রাজভবন থেকে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করেছি এবং পদত্যাগের কথা দলের সব বিধায়ককে জানিয়েছি। সাংসদদেরও। সবাই পদত্যাগে অনুমোদন দিয়েছেন।’

পদত্যাগের পর নিতীশ যান রাজ্যের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আরজেডির জেলবন্দী নেতা লালু প্রসাদের স্ত্রী রাবড়ি দেবীর সঙ্গে দেখা করতে। সেখান থেকে লালুপুত্র তেজস্বীকে সঙ্গে নিয়ে ও অন্যান্য দলের নেতা–কর্মী–সমর্থকের জনজোয়ারের মধ্য দিয়ে হেঁটে দুই নেতা রাজভবনে যান নতুন জোট সরকারের দাবি জানাতে। ২৪৩ আসনবিশিষ্ট বিহার বিধানসভায় আরজেডির সদস্যসংখ্যা ৭৭। নিতীশ কুমারের দল জেডিইউর সদস্য ৪৩। এ ছাড়া কংগ্রেসের বিধায়ক সংখ্যা ১৯। বিজেপিবিরোধী বিকল্প সরকারকে সমর্থন করার কথা ১৬ বামপন্থী সদস্যেরও।
রাজ্যপাল নতুন সরকার গঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কী সিদ্ধান্ত নেবে, এখনো জানা যায়নি। যদিও দুই দলের বোঝাপড়ায় এটা স্পষ্ট, বিকল্প সরকারে নিতীশই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। তেজস্বী উপমুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভার স্পিকার পদ পাবে তেজস্বীর দল আরজেডি। কংগ্রেস এ সরকারে শামিল হবে কি না এখনো নিশ্চিত নয়।

প্রথমে টিডিপি, তারপর একে একে অকালি, শিবসেনার পর এবার জেডিইউও এনডিএ জোট ছাড়ল। বিজেপির কাছে নিঃন্দেহে এটা বড় ধাক্কা। বিশেষ করে লোকসভার ভোটের বাকি যখন দুই বছরের কম। কেন্দ্রের শাসক দলের কাছে এ ধাক্কা কিছুটা অপ্রত্যাশিতও। কারণ, বিজেপির হয়ে বিহারের দায়িত্ব ছিল যাঁর কাছে, সেই খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভেবেছিলেন, নিতীশ বড়জোর দর–কষাকষি করবেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একাধিক সদস্যের দাবি জানাবেন। বড়জোর বিধানসভার অধ্যক্ষ বিজয় কুমার সিনহাকে বদল করতে বলবেন। কিন্তু রাতারাতি জোট ছেড়ে আরজেডির হাত ধরে তিনি বিকল্প সরকার গড়বেন, এতটা বিজেপি ভাবেনি।

নিতীশকে বুঝতে এত বড় ভুলের জন্য অমিত শাহ নিজেই দায়ী। নিতীশের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা মাপতে ভুল করেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, মহারাষ্ট্র রাজনীতিতে উদ্ধব ঠাকরের যে দশা তাঁরা করেছেন, জেডিইউকে চাপে রেখে, দল ভাঙিয়ে নিতীশের হালও তেমন করে দেবেন। এ ভাবনার কারণও ছিল। গোবলয়ে বিহার একমাত্র রাজ্য, যেখানে এখনো বিজেপি একবারের জন্যও একক দক্ষতায় ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। এবার সেই লক্ষ্য পূরণে বিজেপি তুরুপের তাস করতে চেয়েছিল জেডিইউর সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরসিপি সিংকে। নিতীশ সেই ছক বুঝতে দেরি করেননি। তাঁর অনুমোদন ছাড়া বিজেপি আরসিপি সিংকে মন্ত্রী করেছিল। রাজ্যসভার মেয়াদ ফুরালে দ্বিতীয়বার সদস্য না করে নিতীশ তাঁর অসন্তোষের কথাটি বিজেপির পাশাপাশি আরসিপি সিংকেও বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আরসিপি সিংয়ের সঙ্গে বিজেপি দোসর হিসেবে পায় জেডিইউর আরেক বিক্ষুব্ধ নেতা অশোক চৌধুরীকে। নিতীশকে বার্তা দিতে গত জুলাই মাসের শেষে বিহারের রাজধানী পাটনায় দলের সব শাখা সংগঠনের বৈঠক ডাকেন শাহ। দুই দিনের সেই বৈঠকে শাহ, জেপি নাড্ডাসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নিতীশের বুঝতে দেরি হয়নি বিজেপি তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি কেটে নেওয়ার খেলায় নেমেছে। তাঁর দশা মহারাষ্ট্রের উদ্ধব ঠাকরের মতো করতে বিজেপি আগে কাজে লাগিয়েছিল লোক জনশক্তি পার্টির চিরাগ পাসোয়ানকে, এবার লাগিয়েছে আরসিপি সিং ও অশোক চৌধুরীকে। তাঁরাই বিহারে বিজেপির ‘একনাথ শিন্ডে’। নিতীশের সেই ধারণা আরও জোরদার হয় বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডার সাম্প্রতিক মন্তব্যে যখন তিনি বলেন, ‘দেশে সব আঞ্চলিক দল শেষ হয়ে যাবে। টিকে থাকবে শুধু বিজেপি।’

ঘুঁটি সাজাতে দেরি করেননি নিতীশও। চারবার প্রধানমন্ত্রীর ডাক উপেক্ষা করে দিল্লি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে তৈরি করছিলেন দূরত্ব। পাশাপাশি দূরত্ব কমাচ্ছিলেন রাজ্য রাজনীতিতে একদা সঙ্গী বর্তমানে প্রতিপক্ষ লালু প্রসাদের দল আরজেডির সঙ্গে। লালুপুত্র তেজস্বীর সঙ্গে একাধিক সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি মিলিত হন। সরাসরি বিরোধিতা করেন ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের। অটল থাকেন জাতিভিত্তিক জনগণনার সিদ্ধান্তে। সমালোচনা করেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের। গত শনিবার সন্ধ্যায় আরজেডির জোটসঙ্গী কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে ফোনবার্তা বুঝিয়ে দেয় জোট ছাড়তে তিনি প্রস্তুত।

বারবার মোক্ষম সময়ে জোট বদল করে নিতীশ জয়ীর হাসি হেসেছেন। এবারও সেই হাসি তিনি হাসবেন কি না, নির্ভর করছে রাজ্যপাল ফাগু চৌহানের মর্জির ওপর, যিনি বিজেপির সাবেক নেতা ও উত্তর প্রদেশের ছয়বারের বিধায়ক। রাজ্যপালকে নিয়ে সংশয় এই কারণে যে জম্মু–কাশ্মীর সরকারের ওপর থেকে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করার পর মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বিকল্প সরকার গড়তে প্রস্তুত ছিলেন। রাজ্যপাল সেই সুযোগ না দিয়ে বিধানসভা ভেঙে দিয়েছিলেন। পরে রাজ্যটাই দ্বিখণ্ডিত হয়। খারিজ হয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ।

আরজেডি কেন নিতীশের পাশে দাঁড়াচ্ছে? এবং কেনই–বা পরবর্তী সরকারে উপমুখ্যমন্ত্রিত্ব গ্রহণে সম্মত হলেন তেজস্বী? সহজ উত্তর, এ ছাড়া আরজেডির কাছে অন্য উপায় ছিল না। লালু প্রসাদ জেলে। সম্প্রতি দুর্নীতি মামলায় আটক করা হয়েছে লালু প্রসাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভোলা যাদবকে। দুই বছরের মধ্যে লোকসভা ভোটে রাজ্যে বিজেপির আরও শক্তি বাড়ার সম্ভাবনা। নিতীশ জোট ছেড়ে বেরিয়ে এলে নতুন সরকারের দিকে হাত বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করেছেন তেজস্বী। বিজেপি বিরোধিতায় একমাত্র যে দলে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি, সেই কংগ্রেস পরিষদীয় দল বিকল্প মন্ত্রিসভাকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। দলের মুখপাত্র পবন খেরা মঙ্গলবার বলেন, শনিবার রাতেই দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের সব বিজেপি বিরোধী দলের এটাই হওয়া উচিত একমাত্র ভূমিকা।

নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি মানতে না পেরে ২০১৩ সালে বিজেপিকে ছেড়ে নিতীশ আরজেডির হাত ধরেছিলেন। ২০১৫ সালে সরকার গড়ার দুই বছরের মধ্যে ২০১৭ সালে আরজেডিকে ছেড়ে ফের হাত ধরেছিলেন বিজেপির। ২০১৯ এর জন্য বিহারে নিতীশকে প্রয়োজন ছিল বিজেপির। ২০২০–তে তাই ছোট শরিক নিতীশকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিল তারা। কিন্তু ক্রমেই জেডিইউর ক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল বিজেপি। এখন দেখার, শিবসেনার মতো জেডিইউয়েও বিজেপি ভাঙন ধরাতে পারে কি না। ২০২৪ সালের ভোটের আগে বিহারে এ ধাক্কা বিজেপি কীভাবে সামলায়, সেটাই পরবর্তী আকর্ষণ।

স্পন্সরেড আর্টিকেলঃ